আব্বাসীয় খিলাফত (১): সূচনালগ্ন এবং খলীফা পদে আবুল আব্বাস

by sultan

(পরম করুনাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি।  সবার প্রতি অনুরোধ, এই সিরিজ শুরু করেছি।  ইনশাআল্লাহ শেষ পর্যন্ত আপনাদের নিয়ে যাবো।  তথ্য কিংবা লেখার বানান কিংবা গঠনগত ভুল থাকলে ক্ষমাসূলভ দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি। )

উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর থেকেই আব্বাসীয় খিলাফতের সূচনা হয়।  এই আব্বাসীয়রা ৭৫০ থেকে ১২৫৮ পর্যন্ত সুদীর্ঘ কাল শাসন ক্ষমতায় ছিল। এই সময়টি ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক গৌরবদীপ্ত অধ্যায়। মুসলিম সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে আব্বাসীয় খিলাফত এক মাইলফলক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।  আব্বাসীয় খিলাফত ছিলো মূলত ইসলামী কৃষ্টি, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক যুগ।  আব্বাসীয় খিলাফতে সর্বমোট ৩৭ জন খলীফা খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন।  উমাইয়া খিলাফতকাল ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে একক আধিপত্যের যুগ, কিন্তু আব্বাসীয় শাসনকালের একটি নির্দিষ্ট সময়ে মুসলিম খিলাফত ৩টি ভাগে ভাগ হয়ে যায়।  বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় খিলাফত, মিসরের কায়রোয়ান কেন্দ্রিক ফাতিমীয় (শিয়া) খিলাফত ও স্পেনের কর্ডোভা কেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন উমাইয়া খিলাফত।  এছাড়া এই বংশের শেষ দিকে দুর্বল সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির কারণে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশের উদ্ভব ঘটে যা এই শাসনামলের একটি গুণগত বৈশিষ্ট্য।  আব্বাসীয় শাসনামলে আরব অনারব নিয়ে কোনোপ্রকার দ্বন্দ্ব ছিল না।  একক আরবীয় জাতীয়তাবাদের স্থলে বিশ্বজনীন মুসলিম শাসনের বিকাশ ঘটে।  কেন্দ্রীয় শাসনে খলীফার পর উযির পদ্ধতির প্রথম সূচনা হয়েছে এই আব্বাসীয় খিলাফতের সময়েই।  যা আব্বাসীয়দের পরবর্তী সকল মুসলিম খিলাফত কিংবা সালতানাতে বহাল ছিলো।  আব্বাসীয় খিলাফতের সময় বাগদাদ পরিণত হয় মুসলিম সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে।  আব্বাসীয় খিলাফতে একদিকে যেমন ছিলো ইসলামী ভূখন্ড বৃদ্ধির মনোভাব তেমনি তার চেয়ে বেশি ছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিতি।  আব্বাসীয় খিলাফতের সময় মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম শিখরে পৌছায়।  যেসময় ইউরোপীয়ানরা পুরোপুরিভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে দুরে ছিলো।  ৫০৮ বছর শাসন করে আব্বাসীয় খিলাফত পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী শাসনকালের ইতিহাস গড়ে।  আবুল আব্বাস আস-সাফফার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত খিলাফত আবু জাফর আল মনসুর, হারুন অর-রশীদ ও আল-মামুনের মত শ্রেষ্ঠ খলীফাদের মাধ্যমে ইতিহাসে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে।  অবশেষে ১২৫৮ খ্রি: কুখ্যাত হালাকু খান কর্তৃক বর্বরোচিত আক্রমণে সর্বশেষ খলীফা আল মুসতাসিম বিল্লাহর শহীদের মধ্য দিয়ে এই খিলাফতের অবসান ঘটে। 

উমাইয়া খিলাফতের অবস্থা ও আব্বাসীয়রা

আব্বাসীয় খিলাফতের নামকরণ হয়েছে মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আল আব্বাস (রাঃ) এর নাম হতে।  তাঁর নামানুসারে এই খিলাফতের নামকরণ হয়েছে আব্বাসীয় খিলাফত।  তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), ফজল, উবায়দুল্লাহ ও কায়সার নামে ৪ পুত্র রেখে ৩২ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।  তার ৪ পুত্রই হযরত আলী (রাঃ) এর অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।  হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) তিনি ইসলামের ইতিহাসে একজন প্রখ্যাত হাদীসবেত্তা হিসেবে মশহুর রয়েছেন।  ইসলামে তার অবদান অনস্বীকার্য।  ইমাম হুসাইন (রাঃ) কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে শহীদ হলে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত মনে  ৬৮৭ খ্রি. ৭০ বছর বয়সে তায়িফে ইন্তিকাল করেন।  ৭৩৫ খ্রি: আলী (রাঃ) শহীদ হয়ে ইন্তেকাল করার পর তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আলী খিলাফত গঠনের পরিকল্পনা করেন। তিনিই ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের স্বপ্নদ্রষ্টা।  তিনি সর্বপ্রথম খিলাফত পরিচালনা করার ইচ্ছা পোষণ করেন।  কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার পর খিলাফত ব্যবস্থা ইবনুল হানাফিয়ার হাতে অর্পিত হয়।  তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হাশিম নেতৃত্ব লাভ করেন।  হাশিম তাঁর মৃত্যুর পূর্বে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর প্রপৌত্র মুহাম্মদকে নেতৃত্ব অর্পন করেন।  মুহাম্মদ ইবনে আলী তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নের পূর্বেই ৭৪৪ খ্রি: ইন্তেকাল করেন।  মৃত্যুর পূর্বে তিনি ৩ পুত্র ইব্রাহিম, আবুল আব্বাস ও আবু জাফরকে পরপর তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করে যান।

আবুল আব্বাসের বংশধরগণ ছিলেন হাশিমী গোত্রভুক্ত ও মহানবী (সাঃ) এর নিকটাত্মীয়।  তাই নবী পরিবারের পাশে আব্বাসীয় আন্দোলনকে জনগন স্বাগত জানায়।  উমাইয়া শাসনের কুপ্রভাব, কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা, আরব-অনারব বৈষম্য, গোত্রীয় দ্বন্দ্ব ইত্যাদি উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম জনমনে বীতশ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়।  তারা এই শাসনের সমাপ্তি কামনা করে।  পারস্য অঞ্চলের সুন্নী মুসলিমগণ উমাইয়াদের নৈতিক অধঃপতন ও ইসলাম হতে বিচ্যুতি ও বৈষম্যমূলক আচরণ হতে পরিত্রাণ পাবার আশায় আব্বাসীয় খিলাফত গঠনের আন্দোলনকে স্বাগত জানায়।  এভাবে আব্বাসীয় খিলাফত গঠনের প্রক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে একটি সার্বজনীন রূপ হিসেবে।

মূলত উমাইয়া খলীফা দ্বিতীয় ইয়াজিদের সময় হতেই এই আব্বাসীয় আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে।  এর ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়।  পরবর্তীতে উমাইয়া খলীফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর এই আন্দোলন আরো জোরদার হয় এবং  উমাইয়া খলীফা দ্বিতীয় মারওয়ানের শাসনামলে তা তীব্র আকার ধারণ করে।  এসময় আব্বাসীয় আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলো মুহম্মদ ইবনে আলীর পুত্র ইব্রাহিম। সৌভাগ্যক্রমে এই সময় আবু মুসলিম খোরাসানী নামক আরব বংশোদ্ভূত ইস্পাহানবাসীর আবির্ভাব ঘটে যিনি নিজেকে আব্বাসীয় প্রচার কাজে সম্পৃক্ত করেন। তিনি একজন দক্ষ সামরিক সংগঠক ও কৌশলী সেনানায়ক ছিলেন।  তিনি খোরাসান অঞ্চলে আব্বাসীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন। খোরাসান অঞ্চলে ব্যাপক প্রচার অভিযানের ফলে আবু মুসলিম খোরাসানী ব্যাপক সমর্থন লাভ করেন।  খোরাসান আব্বাসী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়।  উমাইয়া খলীফা মারওয়ান তখন সিরিয়ায় ব্যস্ত ছিলেন।  খোরাসানের সর্বশেষ উমাইয়া গভর্ণর নসর বিন সাইয়্যার কিরমান তখন খারিজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন।  এই সুযোগে আবু মুসলিম খোরাসানের রাজধানী মার্ভ দখল করেন ৪৭৭ খ্রিষ্টাব্দে।  গভর্নর নসর আবু মুসলিমের সেনাপতি কাহতাবা কর্তৃক পরাজিত হন ও খলীফা মারওয়ান কর্তৃক প্রেরিত সাহায্য পৌছাবার পূর্বে নসর  পলায়নরত অবস্থায় নিহত হন।  এভাবে খোরাসান আব্বাসীদের হস্তগত হয়।

খলীফা মারওয়ান আব্বাসীয় আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হিসেবে পরিচিত ইব্রাহিমকে বন্দী করেও কারাগারে পাঠান।  তবুও সমানগতিতে এই আন্দোলন পরিচালিত হতে থাকে।  আবু মুসলিমের সেনাপতি কাহতাবা ও খালিদ ইউফ্রেটিস নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে উমাইয়া সেনাপতি ইয়াজিদকে পরাজিত করেন।  যুদ্ধে ইয়াজিদ পরাজিত হন, কাহতাবা নিহত হলে তাঁর পুত্র হাসান আব্বাসীয় বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।  আবু মুসলিমদের অপর সেনাপতি আবু আয়ান মারওয়ানের পুত্র আব্দুল্লাহকে পরাজিত করে নিহাওয়ান্দ ও মেসোপটেমিয়া অধিকার করেন। এই সংবাদ পেয়ে মারওয়ান ইব্রাহীমকে হত্যার নির্দেশ  দেন।  ইব্রাহীমের মৃত্যুর পর আবুল আব্বাস আস-সাফফা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

টাইগ্রিস নদ

আব্বাসীয়দের হাতে ৭৪৯ খ্রি: কুফা বিজিত হয় এবং আবুল আব্বাস কুফার মসজিতে খলীফা হিসেবে ঘোষিত  হন।  ইরাকবাসী এতে পূর্ণ সমর্থন জানায় ও তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।  উমাইয়া খলীফা দ্বিতীয় মারওয়ান তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেন আব্বাসীয়দের প্রতিহত করতে।  ১,২০,০০০ সৈন্য সমেত তিনি  টাইগ্রিস নদী অতিক্রম করে জাব নদীর তীরে অগ্রসর হন।  আব্বাসীয় বাহিনী আবুল আব্বাসের পিতৃব্য আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে সমবেত হয়।  ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারী জাব নদীর তীরে কুসাফ নামক গ্রামে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।  যুদ্ধে উমাইয়া খলীফা মারওয়ান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং মসুল, হাররান হয়ে দামেস্কে পলায়ন করেন।  সেখান হতে প্যালেস্টাইন হয়ে মিসরের দিকে পলায়ন করেন। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি ধৃত এবং নিহত হন।  তাঁর মস্তক কুফায় আব্দুল আব্বাসের নিকট প্রেরণ করা হয়। খলীফা মারওয়ানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উমাইয়া খিলাফত বিলুপ্ত হয় এবং আব্বাসীয়গণ খিলাফতে অধিষ্ঠিত হন।  (চলবে)

  • সুত্র:
  • উইকিপিডিয়া,
  • আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাস (আরবীয় লেখ বনু হাসান)
0 মন্তব্য
2

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!