আব্বাসীয় খিলাফত (২): প্রথম খলীফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর শাসন

by sultan

উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর থেকেই আব্বাসীয় খিলাফতের সূচনা হয়।  এই আব্বাসীয়রা ৭৫০ থেকে ১২৫৮ পর্যন্ত সুদীর্ঘ কাল শাসন ক্ষমতায় ছিল। এই সময়টি ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক গৌরবদীপ্ত অধ্যায়। মুসলিম সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে আব্বাসীয় খিলাফত এক মাইলফলক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।  আব্বাসীয় খিলাফত ছিলো মূলত ইসলামী কৃষ্টি, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক যুগ।  আব্বাসীয় খিলাফতে সর্বমোট ৩৭ জন খলীফা খিলাফত পরিচালনা করেছিলেন।

আবুল আব্বাস ছিলেন আব্বাসীয় খিলাফতের প্রথম খলীফা।  তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব।  তিনি ছিলেন রাসূল (সাঃ) এর অন্যতম চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ) এর উত্তরসূরী।  জাব নদীর তীরে ৭৫০ খ্রিঃ আব্বাসীয় সেনাপতি আব্দুল্লাহর নিকট উমাইয়া বংশের শেষ খলীফা দ্বিতীয় মারওয়ানের পরাজয়ের মাধ্যমে আব্বাসীয়গণ ক্ষমতা লাভ করে।  কুফার জামে মসজিদে আবুল আব্বাস খলীফা হিসেবে ঘােষিত হন এবং জনগণ তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে।  তিনি আস-সাফফাহ বা অধিক রক্ত প্রবাহকারী উপাধি গ্রহণ করেন।  এরপর তিনি একে একে অবশিষ্ট থাকা সকল উমাইয়া মাথাওয়ালাদের নিধন করেন।  ফলে উমাইয়া খিলাফতের সমর্থকরা  বিশেষ করে দামেস্ক, হিমস, কিন্নির্সিরিন, ফিলিস্তিন এর লােকজন নিজেদের দাড়িগোঁফ কামিয়ে আব্বাসী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।  আবুল আব্বাস অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এইসকল বিদ্রোহ দমন করেন।

ইয়াজিদ বিন হুবায়রার পতনঃ
২য় মারওয়ানের মৃত্যুর পরও ইরাকের শাসনকর্তা ইয়াজিদ বিন হুবায়রা ওয়াসিতে নিজ কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন।  তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান নামক জনৈক ব্যক্তিকে হযরত আলী (রাঃ) এর বংশধর হিসেব খলীফা ঘােষণা করেন।  এই সময় আবুল আব্বাস ইয়াজিদকে দমন করার জন্য তাঁর ভ্রাতা আবু জাফর ও সেনাপতি কাহতাবা কে প্রেরণ করেন।  ইয়াজিদ দীর্ঘ ১১ মাস অবরুদ্ধ থাকার পর প্রাণরক্ষার প্রতিশ্রুতিতে আত্মসমর্পন করেন।  শেষ পর্যন্ত তাঁর পুত্র ও বহু অনুচরসহ নিহত হন। 

রাজধানী স্থানান্তরঃ
আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ তার রাজধানী ইরাকের কুফা হতে আল-আনবারে স্থানান্তরিত করেন।  সেখানে তিনি আল হাশিমীয়া নামক একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন।  প্রশাসনিক কর্তা নিয়ােগ আবুল আব্বাস খলীফা হওয়ার পর প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তাঁর সমর্থকদের নিয়ােগ করেন। এতে তাঁর প্রশাসনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।  খলীফা তাঁর ভ্রাতা আবু জাফরকে মেসােপটেমিয়ায়, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের শাসনকর্তা; পিতৃব্য দাউদ ইবনে আলীকে হিজায, ইয়ামেন ও ইয়ামামায় , আব্দুল্লাহ ইবনে আলীকে সিরিয়ায়, সুলাইমান ইবনে আলীকে বসরায়; আবু মুসলিমকে খােরাসানের এবং আয়ুনকে মিসরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন।  খালিদ ইবনে বার্মাককে অর্থমন্ত্রী ও আবু সালমা খাল্লালকে উযীর হিসেবে নিযুক্ত করেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকারী মনােনয়নঃ
চার বছর তিন মাস রাজত্ব করার পর ৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ ৩০ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।  মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর ভ্রাতা আবু জাফরকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনােনীত করে যান এবং ভ্রাতুস্পুত্র ঈশাকে তৎপরবর্তী উত্তরাধিকারী মনােনীত করে যান।  আস-সাফফাহ এক পুত্র মুহাম্মদ ও রাইতা নামক এক কন্যা রেখে যান।  পরবর্তীতে আল-মাহদীর সাথে রাইতার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।  চরিত্র ও কৃতিত্ব নিজ বংশের স্বার্থে আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ একজন নিষ্ঠুর প্রকৃতির লােক ছিলেন।  এসকল নিষ্ঠুরতার উর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন দারুণ সামরিক সংগঠক, দক্ষ সৈনিক ও কর্তব্যপরায়ণ শাসক। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল নিষ্কলুষ।  তিনি মাত্র একজন স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন (উম্মে সালমা)। খলীফা তাঁর স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত অনুরুক্ত ছিলেন।  তিনি কুফা হতে আনবারে রাজধানী স্থাপন করেন।  আব্বাসীদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করেন।  তিনি অট্টালিকা, রাজপ্রাসাদ, কুফা হতে মদিনা পর্যন্ত দীর্ঘ জনপথ তৈরি করেন এবং হজযাত্রীদের সুবিধার জন্য তিনি এর স্থানে স্থানে সরাইখানা নির্মাণ করেন।  আব্বাসীয় প্রশাসন ব্যবস্থায় উযির ও জল্লাদের পদ তিনি প্রথম সূচনা করেন। তিনি একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন।  (চলবে)

0 মন্তব্য
1

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!