আব্বাসীয় খিলাফত (৩): দ্বিতীয় খলীফা আল মনসুর ও তার স্বর্ণালী শাসন

by sultan

আবু জাফর আল মনসুর ছিলেন আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলীফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহর জ্যেষ্ঠ্য ভ্রাতা। তাঁর নাম ছিল আবু জাফর। সিংহাসনে আরােহণ করে তিনি আল মনসুর (বিজয়) উপাধি গ্রহণ করেন।  ইতিহাসে তিনি এই নামেই অধিক পরিচিত।  আবুল আব্বাস ৭৫৪ খ্রি: মারা যান।  মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর ভ্রাতা আবু জাফরকে সিংহাসনের জন্য মনােনীত করে যান।  এই সময় আবু জাফর মক্কায় হজ্ব পালনে ব্যস্ত ছিলেন।  তিনি দ্রুত কুফায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ।করেন। 

অভ্যন্তরীণ নীতি:
আবুল আব্বাস যদি আব্বাসীয় বংশের প্রতিষ্ঠাতা হন তাহলে আবু জাফর আল মনসুর ছিলেন এই বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।  তিনি শাসন ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করেছিলেন, বিদ্রোহ দমন করেন এবং সুন্নী ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন।  তিনি শাসনপ্রণালীতে ধর্মীয় ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটান।  তিনি তার শত্রু মিত্র উভয়কেই সমান নজরে দেখতেন। 

আব্দুল্লাহর বিদ্রোহ দমন:
আল মনসুরের খিলাফত লাভের পর তাঁর চাচা সিরিয়ার শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ বিদ্রোহ ঘােষণা করেন।  কারণ আবুল আব্বাসের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাবের যুদ্ধে যিনি বিজয়ী হবেন তিনি পরবর্তীতে খিলাফতের অধিকারী।  কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে আব্দুল্লাহ বিদ্রোহী হন।  আল-মনসুর আবু মুসলিমকে আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন।  ৭৫৪ খ্রি: নাসিবিনের যুদ্ধে আবু মুসলিম আব্দুল্লাহকে এক তুমূল যুদ্ধে পরাজিত করেন। আব্দুল্লাহ বসরায় তাঁর ভ্রাতা সুলায়মানের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন।  পরে আব্দুল্লাহ তাঁর পুত্রসহ হাশিমীয়ার অনতিদূরে একটি দুর্গে কারারুদ্ধ হন।  সাত বছর বন্দী থাকার পর তাকে লবণের ভিত্তির উপরে নির্মিত একটি প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়।  কিন্তু একদিন প্রবল বর্ষণে বাড়িটি ধ্বসে পড়ে ও আব্দুল্লাহ ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে নিহত হন। 

আবু মুসলিমের পতন:
আবু মুসলিম খুবই প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।  তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। তাই তিনি ভবিষ্যতে খিলাফতের প্রতি হুমকি স্বরূপ হওয়ার পূর্বেই তাকে দমনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।  আবু মুসলিমকে আল মনসুর রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানান। তাঁর সাথে উচ্চবাক্যের পর কৌশলে তাকে গুপ্তঘাতক দ্বারা হত্যা করেন।  আবু মুসলিম ছিলেন আব্বাসী বংশের ‘Kingmaker’, একজন অসাধারণ সামরিক সংগঠক।  তিনি প্রায় ৬ লক্ষ উমাইয়াকে প্রাণে হত্যা করেছিলেন।  তাই ভবিষ্যতের হুমকি মনে করে আল মনসুর তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

সানবাদের বিদ্রোহ দমন:
 আবু মুসলিমের পতনের পরে পারস্য ও খােরাসান অঞ্চলে তাঁর অনুচর ও সমর্থকগণ ব্যাপক বিদ্রোহ সৃষ্টি করে।  এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন মাজুনি দলপতি সানবাদ।  খলীফা আল মনসুর খােরাসানের বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন।  যুদ্ধে সানবাদ নিহত হন।  এরপর খােরসান অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।  এই সময় আবু মুসলিমের অপর একজন সেনাপতি আবু নাসের খলীফার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং খলীফা তাকে ক্ষমা করে দেন।

রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়কে দমন

রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়কে দমন:
পারস্যের রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায় আল মনসুরকে আল্লাহর অবতার’ বলে গণ্য করত।  তারা উগ্রপন্থী ছিল এবং ধর্মবিরােধী কার্যকলাপের জন্য খলীফা ৭৫৮ খ্রি: ২০০ জন রাওয়ান্দিয়াকে বন্দী করেন।  এর কিছুদিন পর এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৬০০ লােক খলীফার সাথে রাজদরবারে দেখা করতে এসে খলীফাকে আক্রমণ করে।  এই সময় মায়ান বিন যায়দার হস্তক্ষেপের ফলে খলীফা রক্ষা পান।  পরবর্তীতে খলীফা রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়কে কঠোর হস্তে দমন করেন।

তাবারিস্তান ও খােরাসানের বিদ্রোহ দমন:
 রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়কে দমনের পর ৭৫৯ খ্রি: খােরাসানের শাসনকর্তা খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে।  এই বিদ্রোহ দমনের জন্য খলীফা তাঁর পুত্র আল-মাহদী ও সেনাপতি খুযাইমাকে প্রেরণ করেন। বিদ্রোহীদের নেতা পলায়ন করেন এবং এতে বিদোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ফলশ্রতিতে খােরাসানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর তাবারিস্তানের শাসনকর্তা ইস্পাহান্দা বিদ্রোহী হলে আল-মাহদী তাকেও পরাজিত করেন। পরবর্তীতে ৭৭৫ খ্রি: খালিদ বিন বার্মাককে খােরাসানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। 

ইফ্রিকিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা:
এই সময় ইফ্রিকিয়াতে বার্বার ও খারিজীগণ আব্বাসীয় খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করলে খলীফা আল-মনসুর ৭৭২ খ্রি: তাদের দমন করেন এবং ইফ্রিকিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।  ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লাব এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল হন ও ১৫ বছর শাসন করেন। 

আল মনসুরের সময়কার ইসলামী ভূখন্ড

ইসলামী ভূখন্ডের বিস্তার:
৭৭৩ খ্রি: আল মনসুর রােমানদের বিরুদ্ধে সালিহ ও আব্বাসের নেতৃত্বে ৭০ হাজারের একটি মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন।  যুদ্ধে রােমান সম্রাট ৪র্থ কনস্টানটাইন পরাজিত হন ও বার্ষিক কর প্রদান করতে সম্মত হন।  মালাতিয়া দুর্গ পুনরায় আব্বাসীয়দের দখলভুক্ত হয়।  সাম্রাজ্যের সুরক্ষার জন্য তিনি গ্রীক সীমান্তে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন।  কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত তাবারিস্তানের অধিবাসীগণ ৭৫৯-৬০ খ্রি: তাদের যুবরাজ ইস্পাহান্দের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করলে, আল মনসুর অভিযান প্রেরণ করে তাদের দমন করেন।  তাবারিস্তান ও গীলান তাঁর দখলে আসে।  দায়লম অঞ্চলটিও আব্বাসীয়দের অধীনস্থ হয়।  খালিদ বিন বার্মাককের নেতৃত্বে এশিয়া মাইনরের উপজাতীয়দের বিদ্রোহ দমন করেন। জর্জিয়া, মসুল, আর্মেনিয়া ও কুর্দিস্তান তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।  তিনি স্পেনে একটি অভিযান প্রেরণ করেন।  যেখানে ৭৫৬ খ্রি: অপর একটি উমাইয়া স্বাধীন আল-আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হয়।  কিন্তু তার এই অভিযানটি সফল হয়নি।  খলীফা মনসুর ২২ বছর রাজত্ব করার পর ৬৫ বছর বয়সে ৭৭৫ খ্রি: মৃত্যুবরণ করেন।  মক্কায় হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে পথিমধ্যে বীরে মায়মুনা নামক স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বাগদাদ

বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা:
বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা (৭৬২-৬৬) করে খলীফা আল-মনসুর চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।  তিনি খিলাফতের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল খুঁজতে থাকেন এবং পারস্য সম্রাট কিসরার গ্রীষ্মকালীন আবাসস্থল বাগদাদকে মনােনীত করেন।  এটি দজলা নদীর পশ্চিম তীরে মনােমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ অবস্থিত।  সিরিয়া, মেসােপটেমিয়া প্রভৃতি অঞ্চল হতে আনীত ১,০০,০০০ শ্রমিক ও শিল্পী সুদীর্ঘ ৪ বছর (৭৬২-৬৬) অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রায় ৪৮,৮৩,০০০ দিরহাম ব্যয়ে এ নতুন রাজধানী নির্মাণ করেন।  এ নগরীর নামকরণ হয় “দারুস-সালম’ (শান্তি নিবাস)। এটিকে খলীফার নামানুসারে ‘মনসুরীয়া’ও বলা হয়ে থাকে। এটি ছিল বৃত্তাকার ও ২ প্রাচীর বিশিষ্ট নগরী এর কেন্দ্র ছিল।  রাজপ্রাসাদ, জামে মসজিদ, প্রধান প্রধান রাজকর্মচারীদের অট্টালিকা, উদ্যান ও কৃত্রিম ফোয়ারা।  আরব্য রজনীর বাগদাদ ছিল তকালীন বিশ্বের বিস্ময় ও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্র। 

আব্বাসীয় এলিট ফোর্স

নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠন:
আল-মনসুর বহিঃশক্তির আক্রমণ হতে নিরাপদ থাকা ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের জন্য একটি সুদক্ষ নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠন করেন।  তিনি সৈনিকদের উচ্চ পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করেন।  গুপ্তচর বাহিনী নিয়ােগ তিনি অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য গুপ্তচর বাহিনী গঠন করেন। যা সাম্রাজ্যের সর্বত্র হতে খলীফাকে সংবাদ প্রেরণ করতাে।

প্রদেশের সীমানা পুনঃনির্ধারন:
বিশাল সাম্রাজ্যকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও রক্ষনাবেক্ষণের জন্য তিনি প্রদেশের সীমানা নির্ধারণ করেন। সৎ ও যােগ্যতার ভিত্তিতে তিনি প্রদেশপাল নিয়ােগ করতেন।  সুষ্ঠুভাবে শাসন কার্য পরিচালনার জন্য তিনি প্রশাসনিক কর্মচারীদের রদবদল করতেন। 

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা:
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য খলীফা আল-মনসুর সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহরে কাজী নিয়ােগ করেছিলেন।  বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে কাজীগণ নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ছিলেন।  মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমানকে বাগদাদের প্রধান কাজী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তিনি উক্ত পদে প্রায় ২০ বছর বহাল ছিলেন।  খলীফা বিচারকার্যের প্রতি আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখে গেছেন।  একদা তাঁর বিরুদ্ধে কতিপয় উস্ট্রের মালিকের অভিযােগ আরােপিত হলে তিনি কাজীর রায় মেনে নেন এবং কাজীকে তাঁর সততা ও নিরপেক্ষতার জন্য পুরস্কৃত করেন। 

জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপােষক:
খলীফা আল-মনসুর শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন।  আব্বাসীয় খিলাফতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ভিত্তি তিনিই প্রথম রচনা করেন। তিনি তাঁর রাজ্য জুড়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব ও শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন এবং এর পৃষ্ঠপােষকতা করেন। তিনি নিজেও একজন শিক্ষানুরাগী ও পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। 

জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি:
 খলীফা আল-মনসুর তাঁর জনগণের কল্যাণ ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য বহু রাজপথ, সরাইখানা, নগর ও চিকিৎসালয় স্থাপন করেন।  তিনি সাম্রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি অর্থনীতির প্রতি মনােযােগী হন। তিনি শিক্ষাকেন্দ্র ও গবেষণাগার স্থাপন করেন। (চলবে)

  • সুত্র:
  • উইকিপিডিয়া,
  • আব্বাসীয় খিলাফতের ইতিহাস
  •   ( আবনু হাসান -আরবীয় লেখক) الخلافة العباسية
0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!