আর্মেনীয় গণহত্যা: উসমানীয়দের বিরুদ্ধে এক ঘৃণ্য মিথ্যাচার

by sultan

[মূল লেখাটা পড়ে বেশ ভালো লেগেছিল, জানা হয়েছিল অনেক ইতিহাস। আর মনে হচ্ছিল ইংরেজীতে লেখার কারণে হয়ত অনেকেই ভালো এই লেখাটি পড়েননি। সেকারণেই অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিলাম লেখকের অনুমতিক্রমে। আগে তেমন অনুবাদ করা হয়নি, তাই আশা করি পাঠকরা লেখার বিষয়বস্তুর পাশাপাশি যদি অনুবাদের মানের উপরও কিছু ফিডব্যাক দেন তো ভালো লাগবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এমনিতেই একটা গোলমেলে বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দু’পক্ষের দেশগুলো কে কে ছিল, যুদ্ধের কারণ ও গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা থাকলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবহ ও গতিপ্রকৃতি আমার কাছে সবসময়ই বেশ ধোয়াসা। এই অনুবাদ থেকে যুদ্ধের আবহ সম্পর্কে কিছুটা জানা যাবে আশা করি। আর পাশাপাশি জানা যাবে আমাদের প্রায় সবার কাছেই অপরিচিত আর্মেনীয় জাতি ও তাদের দাবী করা গণহত্যার ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও তার বিশ্লেষণ। আশাকরি পাঠকদের ভালো লাগবে।]

শেখ আব্দাল কাদের আস-সুফি ২০১০ সালে বলেছেন, “গণহত্যা অনেকক্ষেত্রেই আবিষ্কৃত শব্দের মত; যা দিয়ে একটা জাতিগত গোষ্ঠির সর্বাঙ্গীন ধ্বংস বোঝায়। যে ব্যাপ্তিতে এটাকে সাধারণত সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়, আদতে তা ঘটেনা; কেননা, ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন তখনও বেঁচে থাকে – যেমনটা বেঁচে আছে লক্ষ-কোটি ইহুদি ও আর্মেনীয়। আর বিশ্বাস স্থাপনে ব্যর্থ এই তত্ত্বকে ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ও আঙ্গিক থেকে বের করে এনে, আসলে কি ঘটেছিল তাকে আইনী লেবাস পরানোটাই আসল অর্থে ইতিহাসকে অস্বীকার ও সেইসাথে ক্ষমতাসীনদের নিজস্ব একরৈখিক তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার নামান্তর।”

শেখ আব্দাল কাদের আস-সুফি স্কটল্যান্ডের জন্মগ্রহন করেন ১৯৩০ সালে ও ইসলামে দীক্ষিত হন ১৯৬৭ সনে।

আর্মেনীয়দের দাবী, ১৯১৫-১৬ সালের অটোম্যান সাম্রাজের বিভক্তির সময় প্রায় ১৫ লক্ষ আর্মেনীয় গণহত্যার কবলে পড়ে। অন্যদিকে, তুরস্কের ভাষ্য হচ্ছে, আর্মেনীয়দের পূর্ব অনতোলিয়া থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল কেবলমাত্র জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে; আর ১৯১৫-১৬ নিহতদের সংখ্যা অনেক ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা হয়, কেননা নিহতদের অনেকেই আসলে তৎকালীন গণযুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার ফল, এবং কোনভাবেই পরিকল্পিত গণহত্যার অংশ নয়।

অন্য ঘটনাগুলোর মতই আর্মেনীয় গণহত্যার বিষয়টিও বিতর্কে জড়িত গোষ্ঠীদের কাছে বেশ সংবেদনশীল বিষয়। কার কাছ থেকে শুনছেন তার উপর ভিত্তি করে ভাষ্য নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। তাই নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক পর্যালোচনা ছাড়া যে কেউ ভুল সিদ্ধান্তে আসতে পারেন, যা হয়ত বিষয়টিকে আরো বিতর্কিত করে তুলবে।

আর এই বিষয়ে কথা শুরুর আগে আসলে গণহত্যা কাকে বলে তা সংজ্ঞায়িত করা দরকার। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে, জাতিসংঘের গণহত্যা বিষয়ক সম্মেলনের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, “নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত কিংবা ধর্মীয় কোনো জনগোষ্ঠীকে অংশত কিংবা সর্বাংশে নির্মূল করার” লক্ষ্যে চালানো কার্যকলাপ হচ্ছে গণহত্যা। এখানে মৌলিক যে উপাদানটা থাকতেই হবে তা হচ্ছে, “নির্মূল করার ইচ্ছা,” যাতে গণহত্যাকে সাধারণ হত্যা থেকে আলাদা করা যায়।

সংজ্ঞা থেকে বুঝতে কষ্ট হয়না কেন বসনিয়া, চেচনিয়া, কসোভো কিংবা রুয়ান্ডা এবং অবশ্যই ১৯৭০ সাল থেকে চলমান বার্মার আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি, জিপসী ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘটা ব্যপক হত্যা, আসলেই গণহত্যা হিসেবেই বিবেচিত হবে। একইভাবে, ১৭৬৯ -১৭৭৩ সালে কলোনিয়াল ইংরেজ শক্তির বাংলায় (বিহার ও উড়িষ্যা সহ) দেড় কোটি নিরপরাধ সাধারণ নাগরিকদের (বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার এক তৃতীয়াংশ লোকসংখ্যা) হত্যার ইতিহাসও গণহত্যারই ইতিহাস। কিন্তু বিংশ শতাব্দিতে তুরস্কে আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে ঘটা ইতিহাসটি তাহলে কি? তারাও কি তবে গণহত্যার বলী?

ঐ সময়ে অটোম্যান সরকারের করা আদমশুমারী ও অন্যান্য সমসাময়িক তথ্য ও উপাত্তের উপর ভিত্তি করে অনেক নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদরাই বলেছেন যে আর্মেনীয়দের দাবী সমর্থনযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়না – কেননা, আলোচ্য এলাকাগুলোতে যুদ্ধের অব্যবহিত আগে ১৫ লক্ষের চেয়ে কম আর্মেনীয় বসবাস করতেন। আর নিহত জনসংখ্যা কীভাবে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশী হয়? প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখা ভালো যে তখন সরকারের আদমশুমারী দপ্তরের প্রধাণ ছিলেন অটোম্যান আর্মেনীয় মিগিরদিচ শাবানিয়ান (১৮৯৭-১৯০৩); তাকে নিশ্চয়ই অটোম্যান সরকারের পক্ষে মিথ্যা কথা বলার দায়ে অভিযুক্ত করা যায়না!

তুর্কি ইতিহাস সমিতির সভাপতি, জনাব ইউসুফ হালাকগ্লু এক হিসেবে বলেছেন যে ঐসময় স্থানান্তর সহ (আন্তঃ জাতিগত প্রতিহিংসা ও সন্ত্রাস ছাড়া) অন্যান্য যুদ্ধজনিত কারণে প্রায় ৫৬ হাজার আর্মেনীয় মারা যান, আর ১০ হাজারের কম আর্মেনীয়কে আসলে সরাসরি হত্যা করা হয়।   

তুরস্কের প্রাক্তণ অস্ট্রেলীয় রাষ্ট্রদূত পি. এফ. পিটার্স বলেছেন যে যুদ্ধকালীন সময়ে  তুর্কিদের কখনোই গণহত্যার পরিকল্পনা ছিলোনা; আর্মেনীয়দের রাশিয়ার সীমান্তবর্তী সম্মুখ সমর অঞ্চল থেকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার খাতিরে কেবল স্থানান্তরিত করা হয়েছিল; কেননা, আর্মেনীয়দের অনেকেই শ্রত্রুপক্ষ রাশানদের সাথে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক সহযোগিতা করছিল। আর্মেনীয় ইতিহাসবিদ মিকায়েল ভারান্দিয়ান তার “History of the Armenian Movement” বইতে বলেছেন, “অটোম্যান আর্মেনীয়রা রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবেই চলাচল করতে পারতো আর রাশানদের চাইতে তুর্কিদের অধীনেই আর্মেনীয়রা ছিল বেশী নিরাপদ, কেননা, রাশান জারদের তুলনায় তুর্কীরা আর্মেনীয়দের ঐতিহ্য, ধর্ম, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিল।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালে এক বিশেষ আইনী প্রক্রিয়ার অধীনে অটোম্যান নির্বাহীদের বিরুদ্ধে আনা আর্মেনীয়দের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হয়। শেভার্সের শান্তি চুক্তির আওতায় পরাজিত অটোম্যান সাম্রাজ্যের উপর আরোপিত গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মিত্র বাহিনীর হাতে তুলে দিতে অটোম্যান সরকার বাধ্য ছিল। এতদানুসারে ব্রিটেন ১৪৪ জন উচ্চপদস্থ অটোম্যান কর্তাব্যাক্তিকে আটক করে মাল্টাতে স্থানান্তরিত করে। স্থানীয় আর্মেনীয় ও তাদের ধর্ম যাযকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আটকাভিযানগুলো চালানো হয়। তাই একদিকে যখন অভিযুক্তদের মাল্টাতে আঁটকে রাখা হয়েছিল, অন্যদিকে অটোম্যান রাজধানীতে সর্বময় ক্ষমতা পাওয়া দখলদার ব্রিটিশ শক্তি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ খুঁজছিল তন্ন তন্ন করে। হাইগ খাজারিয়ান নামের ব্রিটিশ নিযুক্ত জনৈক মার্কিণ বিশেষজ্ঞ অটোম্যান ও ব্রিটিশ সরকারের মহাফেজখানাতে  রক্ষিত সকল দলিল দস্তাবেজ নিয়ে সার্বিক এক গবেষণাকাজ করেন। কিন্তু মাল্টাতে নির্বাসিত অভিযুক্ত অটোম্যান সরকার ও আনুষঙ্গিক নির্বাহীদের বিরুদ্ধে আর্মেনীয়দের হত্যার আদেশ দেয়া কিংবা নিদেনপক্ষে আর্মেনীয়দের হত্যা করতে উৎসাহ দেয়ার কোনো প্রমাণ তিনি পাননি। আর্মেনীয়দের উপস্থাপন করা দলিল দস্তাবেজ তদন্ত করার দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ বিদেশ মন্ত্রকও এমন কোনো প্রমাণ পাননি যা আর্মেনীয়দের দাবীকে সমর্থন করে। মাল্টাতে আঁটকে থাকা সকল অটোম্যান বন্দীদের তাই দুই বছর চার মাস ধরে পরে বিনা বিচারে মুক্তি দেয়া হয়।  আজকের মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর ইরাক কিংবা আফগানিস্তানের অন্যায্য আক্রমন সহ বিজয়ীদের পক্ষে যেভাবে সাধারণত ঘটে থাকে, তেমনিভাবে, বিনা বিচারে আটকে থাকা ও পরে নিপররাধ প্রমাণিত হতভাগ্য এই ব্যক্তিদেরকেও যথারীতি কোনোরকম ক্ষতিপূরণই দেয়া হয়নি।

কিছু আর্মেনীয় গণহত্যার প্রস্তাবকরা দাবী করেন যে, ইহুদি নির্মূলের লক্ষ্যে হিটলারের প্রস্তাবিত “শেষ সমাধান” কে বিশ্ববাসী কীভাবে মূল্যায়ন করবে, এমন প্রশ্ন করা হলে নাকি হিটলার বলেছিল, “আজকে কে আর্মেনীয়দের পূর্ণবিলয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে?” প্রফেসর হিথ লোরী সহ অনেক গবেষকের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, হিটলারের এই তথাকথিত উক্তিটি আদতে সাদামাটা কাগজে অজানা এক লোকের জালিয়াতি মার্কা একটা লেখা, কেননা, দাবী করা হয় যে উক্তিটি ঐদিনে হিটলারের দেয়া দ্বিতীয় ভাষণ থেকে নেয়া, যেখানে আলোচ্য দিনে হিটলারের কেবল একটাই ভাষণ দেবার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রফেসর লোরীর লেখা, “The U.S. Congress and Adolf Hitler on the Armenians, Political Communication and Persuasion, New York, III/2 (1985)” এর ১১১- ১৪০ পাতায় তিনি বলেন, “আর্মেনীয়দের সম্পর্কে হিটলার কখনো কোনো রকমের ইঙ্গিত দিয়েছেন এমনতরো দাবীর কোনো ভিত্তি নেই। “তালাত পাশার টেলিগ্রামকে (The Naim-Andonian documents)” অনেক আর্মেনীয়দের সূত্রে, অটোম্যান সরকারের গণহত্যার অভিপ্রায়ের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবী করা হয় যে ঐ টেলিগ্রামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তালাত পাশা “সকল আর্মেনীয় পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করো” এই মর্মে এক আদেশ দেন। কিন্তু একইভাবে পরবর্তীতে এন্ড্রু মাঙ্গো, এরিক হান যুরখের ও মাইকেল গুন্টারের মতো নির্মোহ ও পক্ষপাতশূণ্য ইতিহাসবিদদের গবেষণাতে দেখা গেছে দাবীটি মোটেই প্রামাণ্য নয়; একে জালিয়াতি না বলা গেলেও নিদেনপক্ষে “আর্মেনীয় গাঁথা” বললে অত্যুক্তি হবেনা।

আর্মেনীয়রা দাবী করে থাকেন যে ১৯১৮ সালে জেনারেল এ্যলেনবি যখন সিরিয়ার এলেপ্পোর দখল নেন, তখন অটোম্যান নির্বাহী নাঈম বে’র অফিসে তালাত পাশার পাঠানো সেই টেলিগ্রামের কপি পাওয়া যায়। দাবী করা হয় যে ব্রিটিশ বাহিনী ক্ষিপ্রতার সাথে আচমকা হাজির হলে আদেশের কপিগুলোকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। ১৯২০ সালে আরাম এন্ডোনিয়ান নামের এক আর্মেনীয় লেখক প্যারিসে সেই টেলিগ্রামের নমুনা ছাপেন। পরে বার্লিনে তালাত পাশাকে হত্যা করা আর্মেনীয় সন্ত্রাসী তেহলিরিয়ানের বিচার সভাতেও এই টেলিগ্রামের নমুনা আদালতে পেশ করা হয়। তবে আদালত ঐ টেলিগ্রামকে প্রামাণিক দলিল হিসেবে গ্রহণ করেননি কিংবা এর সত্যতার পক্ষেও কোনো মতামত দেননি। এতদসত্ত্বেও লন্ডনের দৈনিক টেলিগ্রাফ ১৯২২ সালে এই জালিয়াতি মার্কা দলিলগুলোকেই জেনারেল এ্যলেনবির সেনাদলের আবিষ্কার হিসেবে প্রকাশ করে।

অটোম্যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তালাত পাশা

কিন্তু ব্রিটিশ বিদেশ মন্ত্রকের যুদ্ধ বিষয়ক শাখা যখন পরে এই ব্যপারে অনুসন্ধান চালায়, যেখানে এ্যলেনবি নিজেও উপস্থিত ছিলেন, তখন দেখা যায় যে কথিত টেলিগ্রামটি তাদের অভিযানের সময় আসলে পাওয়া যায়নি; বরং প্যারিসের এক আর্মেনীয় গ্রুপের কাছে এটা প্রথম পাওয়া যায়। পরে গভীর পরীক্ষা নিরীক্ষাতে দেখা যায় যে, এ্যন্ডোনিয়ান বইগুলোতে প্রকাশিত ছবিগুলোর সাথে অটোম্যান প্রশাসনিক দলিলের শাব্দিক, আক্ষরিক, ভাষা ও বিন্যাসগত ব্যপক অমিল রয়েছে; মানে এই দাঁড়ালো যে, এগুলো আসলে এ্যন্ডোনিয়ান ও তার প্রতিভূদের স্থুল জালিয়াতি করে বানানো কাগজাদি। উল্টোদিকে বরং ঘটনার দিনেরই কিছু সরকারী নির্দেশ সংক্রান্ত প্রামান্য দলিল অটোম্যান আর্কাইভে পাওয়া যায়, যেখানে দেখা যায় তালাত পাশা স্থানান্তরী কাফেলা উপর আক্রমণকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির আদেশ দিয়েছিলেন। একদিকে গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে অন্যদিকে আবার দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়ার আদেশ দেয়ার ব্যপারটা স্বভাবতই যুক্তিসঙ্গত নয়।

গণহত্যা শুরু হয় কোনো জাতিগোষ্ঠীর উপর অনৈতিক বিদ্বেষ ও বৈষম্য থেকে। যেখানে মিগ্রিদিচ শাবায়ানের মতো আর্মেনীয় উঁচু সরকারী পদে উঠে আসতে পেরেছেন, সেখানে আর্মেনীয়রা অটোম্যান তুরষ্কে বৈষম্যের শিকার ছিলেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন। বরং অন্যান্য নাগরিকদের মতোই আর্মেনীয়দেরও আমরা অটোম্যান সাম্রাজ্যে উঁচু পদে বহাল থাকতে দেখি। ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখ্যপ্রমাণ থেকে দেখা যায় ২৯ জন আর্মেনীয় পাশার সমমানের পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন; যা অটোম্যান বাহিনীতে জেনারেলের পদমর্যাদার সমান। এছাড়াও ২২ জন আর্মেনীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রকে নির্বাহী পদে, ৩৩ জন পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রতিনিধি, ১৮ জন বিদেশে রাষ্ট্রদুত অফিসে ও ১১ জন বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। 

তুর্কি স্থল সৈন্য দলের প্রাক্তণ চিফ অফ জেনারেল স্টাফ ও পরে রয়্যাল প্রুশিয়ান পদাতিক ডিভিশনের প্রধাণ জেনারেল ব্রন্সার্ট ফন শেলেনডর্ফ বলেন, অটোম্যান রাজ্যে আর্মেনীয়রা অন্যান্য নাগরিকদের মতোই সমান সামাজিক ও নাগরিক সুবিধা উপভোগ করতেন। ১৮৭৭-৭৮ সালের তুর্কী-রাশান যুদ্ধের পূর্ববর্তী আবহ সম্পর্কে “Turkey in Europe” বইয়ে, স্যার চার্লস এলিয়ট বলেছেন, “তুর্কি ও আর্মেনীয়দের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক ছিল … যেখানে রাশানরা আর্মেনীয়দের চার্চ, স্কুল ও ভাষাকে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেখানে তুর্কিরা ছিলো রাশানদের তুলনায় অনেক বেশী উদার ও সহনশীল। আর্মেনীয়রা কীভাবে প্রার্থনা করবে কিংবা স্কুল চালাবে তা নিয়ে তুর্কিদের কোনো মাথাব্যথা ছিলোনা… ঐদিকে আদ্যোপান্ত প্রাচ্যেরই অংশ আর্মেনীয়রা সবসময় তুর্কি চিন্তাধারা ও আচারাদি পছন্দই করতো … তারা তুর্কিদের মাঝে বসবাস করতে বেশ স্বাচ্ছন্দই বোধ করতো … আর সম্পদের পাল্লাটা কিন্তু খৃষ্টাণদের দিকেই বেশী ভারী ছিল। তুর্কিরা অবশ্য আর্মেনীয়দের উপর খোশমেজাজী আস্থাই রাখতো …”

এমন কোনো তুর্কি বুদ্ধিজীবি, বিজ্ঞানী কিংবা ইতিহাসবিদ নেই যিনি দ্বন্দ্বের সময় যে অনেক আর্মেনীয় মারা যান তা অস্বীকার করেন; কিন্তু তারা এটাও অস্বীকার করেন যে সে সময় কোনো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। বার্নাড লুইস (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি), হিথ লাঊরি (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি), জাস্টিন ম্যাককার্থি (ইউনিভার্সিটি অফ লুইভিল), গাইলস ভেইনষ্টেইন (কলেজ ডি ফ্রান্স) ও স্ট্যানফোর্ড শ (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলেস) – দের মতো অটোম্যান ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ অনেক পশ্চিমা ইতিহাসবিদ ঘটণাতে গণহত্যার ছাপ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিমত, প্রথম বিশ্ব-যুদ্ধকালীন সময়ে জাতিগত দ্বন্দ্ব খৃষ্টান ও মুসলিম উভয় পক্ষের অনিয়মিত সৈন্য ও শক্তিদের হস্তক্ষেপ সহ তৎকালীন সময়ে আনাতোলিয়া ও অনুবর্তী এলাকাতে ঘটে যাওয়া দূর্যোগ ও মহামারীর কারণে সংকটময়ী রূপ নেয়, এর ফলে অনেক প্রাণহানি ঘটে।

রটনাকারী আর্মেনীয়দের দাবী, যে তাদের বিরূদ্ধে ঘটে যাওয়া গণহত্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীতে ইহুদিদের বিরূদ্ধের সংঘটিত গণহত্যার অনুরূপ। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, ইহুদি গণহত্যার সাথে সমতূল্যতার এমন দাবীর বিরূদ্ধে অসংখ্য প্রমাণ ও যুক্তি আছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় –

(ক) নিয়মতান্ত্রিক ভাবে গণহত্যার পরিকল্পনার কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়না।

(খ) আর্মেনীয়দের আলাদা করে সমবেত করা হতে পারে এমন কোনো তালিকা কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতির বিবরণ পাওয়া যায়না।

(গ) আর্মেনীয়দের নির্মূল করার জন্যে জৈব, রাসায়নিক কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতি প্রয়োগ করার প্রমাণ পাওয়া যায়না।

(ঘ) আর্মেনীয়দের জোরপূর্বক নির্বাসিত করে কয়েদি হিসেবে গণ্য করার কোনো দলিল পাওয়া যায়না।

(ঙ) কয়েদ করার যে দাবী আর্মেনীয়দের পক্ষ থেকে তোলা হয় তা কেবল আর্মেনীয় মিলিশিয়া দের ক্ষেত্রে সত্যি ছিল – তবে তা কখনোই অন্ধ জাতিগত পক্ষপাতে পরিণত হয়নি; এই ধরনের বৈষম্যনীতি বাস্তবায়ন করার শক্তি ও সামর্থ্য তৎকালীন অটোম্যান সাম্রাজ্যের ছিলোনা।

(চ) হলোকাস্ট এর সাথে তুলনা করার মতো বন্দীশালার অস্তিত্বের ন্যূনতম প্রমাণিক তথ্য/বিবরণ পাওয়া যায়না।

(ছ) আর্মেনীয়দের উদ্দেশ্য করে সরকারীভাবে আয়োজিত কোন ধরণের জনসভা করার কথা জানা যায়না।

আরো কিছু কারণে ইহুদি হলোকাস্টের সাথে তূলনা করা সমর্থনযোগ্য নয়। এরল বোযোক যেভাবে বলেছেন:

“১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে, ১৯১৯ সালের দিকে ইহুদিরা নিরপরাধ জর্মনদের আক্রমন করে হত্যা করেনি কখনো। বিপরীতে, আর্মেনীয়রা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ২০ বছর আগে, ১৮৯৪ সালে নিরপরাধ তুর্কিদের হত্যা করা শুরু করে।

২. ১৯৩৯ সালে জার্মানীতে যুদ্ধকালীন সময়ে ইহুদিরা গণহারে সোভিয়েত, ব্রিটিশ কিংবা ফরাসী বাহিনীতে যোগ দেয়নি। ঐদিকে আর্মেনীয় সুত্রগুলোই বলছে যে, প্রায় দেড় লক্ষ আর্মেনীয়, রাশান বাহিনীতে যোগদান করে অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরূদ্ধেই যুদ্ধ করছিল।

৩. সস্পূর্ণ জার্মানী ও দখলকৃত অঞ্চলের অনেকাংশ থেকে ইহুদিদের ডেথ-ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল। ঐদিকে পূর্ব তূরষ্কের আর্মেনীয়দের (যে অঞ্চল রাশান বাহিনী দখল করে নিয়েছিল) অটোম্যান সাম্রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল। আর পশ্চিম তূরষ্কে থাকা আর্মেনীয়দের মোটের উপর যে যেখানে ছিল, তাদের সেখানেই থাকতে দেয়া হয়েছিল। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, পূর্ব তূরষ্ক থেকে স্থানান্তরের সময় কী অনেক আর্মেনীয় মারা যান? স্থানাতরের এই শোকাবহ ঘটনাকে অনেক সুত্রই “বুলেটবিহীন গণহত্যা” বলে আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু সেসব সুত্রই আবার ঐ একই দূর্ভিক্ষ ও মহামারীতে মৃত্যুবরণ করা অসংখ্য তুর্কি শরণার্থীদের ব্যপারে নিরব। 

৪. হলোকস্টের ইহুদি নিধণযজ্ঞ ভালোভাবেই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। ওটা ছিল একটা জাতিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্যে অন্য জাতির করা সুশৃংখল পরিকল্পনা; আর ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে আছে অসংখ্যা ছবি, সচল চিত্র কিংবা বিভীষিকার গাঁথা। আর্মেনীয়দের ক্ষেত্রেও অবশ্য তাদের বিরূদ্ধে ঘটা হত্যাযজ্ঞের সচিত্র প্রমাণ আছে; তবে আর্মেনীয়দের হাতে তুর্কিদের হত্যারও প্রমাণ আছে অগুণতি। এর বাইরে আর্মেনীয়দের গণহত্যার দাবী কার্যত পশ্চিমা সুত্রগুলোর মাধ্যমে বিশোধিত হয়ে আসা শোনাকথা আর সাক্ষী-প্রমাণের অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। লজ্জাকর ‘এ্যন্ডোনিয়ান দলিল’ কিংবা রাষ্ট্রদূত হেনরি মর্গেনথাউ’র বই এর মতো ‘প্রমাণ’ এর গ্রহণযোগ্যতা বেশ প্রশ্নসাপেক্ষ। যেমন, মর্গেনথাউ কখনো পূর্ব তূরষ্কে যাননি – আর অন্যদিকে তার একান্ত সচিব (যিনি রাষ্ট্রদূতের কাছে আসা তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন) ছিলেন আর্মেনীয়। একজন অটোম্যান পণ্ডিত সম্প্রতি আমাকে বলেছেন, তার বইটি অজানা এক সাংবাদিক দিয়ে লেখানো; যা ‘ঘৃণা সাহিত্যে’র অনবদ্য উদাহরণ বৈ কিছু নয়। ঐদিকে ৮৫ বছর আগেই ‘এ্যন্ডোনিয়ান দলিল’ বৃটিশ সরকার দ্বারা জাল-দলিল হসেবে সব্যাস্ত হয়ে আছে; আর অটোম্যান পণ্ডিত ঐ মূল্যায়নের সাথে অভিন্নমত প্রকাশ করেন। দাবী করা হয় যে ঐ দলিল হচ্ছে প্রাদেশিক কতৃপক্ষের কাছে অটোম্যান সরকারের পাঠানো টেলিগ্রামগুলোর অনুলিপির সংগ্রহ, যেখানে আর্মেনীয়দের সম্পূর্ণ নির্মূল করার আদেশ দেয়া হয়েছে। আর গণহত্যার প্রাক্কালে গণহত্যার অভিসন্ধি প্রকাশ করে এমন টেলিগ্রামের পসরার ‘কাগুজে প্রমাণ’ রেখে যাওয়ার ধারণাটাই আদতে অবান্তর।”  

তাই বুঝতে কষ্ট হয়না যে কেন “Armenia: Secrets of a ‘Christian’ Terrorist State” বইতে ইতিহাসবিদ ও লেখক স্যমুয়েল উইমস লিখেছেন, “অনেক পশ্চিমা লেখক ও পণ্ডিত একমত হয়েছেন যে, প্রতারিত ও অসত্য চিত্রকল্প তৈরীর লক্ষ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সত্যকে বিকৃত করার এহেন চেষ্টা সত্যই ইতিহাসে বিরল … এই আর্মেনীয়রা আনাতোলিয়েয়াতে তাদের মোট জনসংখ্যার চাইতেও বেশী আর্মেনীয় হত্যার শিকার হয়েছেন – এমনতরো দাবী নিয়ে এসেছে।”

তুর্কি-আর্মেনীয় সংঘাতের ইতিহাস আসলেই জটিল ও বিবাদমূলক। অটোম্যান ইতিহাসের উপর অভিজ্ঞ মার্কিণ ইতিহাসবিদ, লুইভিল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জাস্টিন ম্যাককার্থি মনে করেন যে, গতবাঁধা ঢংযের অটোম্যান সাম্রাজ্যের শেষ পরিণতির পশ্চিমা ইতিহাস আসলেই পক্ষপাতদুষ্ট; কেননা, ঐ ইতিহাস লেখাই হয়েছে খৃষ্টান মিশনারি কিংবা ঐসব নির্বাহীদের (খৃষ্টান) বয়ানের উপর ভিত্তি করে, যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোম্যানদের বিরুদ্ধ শক্তি ছিলেন।

ইতিহাসের সামান্য জ্ঞান হয়তো বিষয়টাকে ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। প্রফেসর ম্যাককার্থির মতে, “তুর্কি ও আর্মেনীয়দের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্ব আসলে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আরো ১০০ বছর আগে। রাশান সাম্রাজ্যের কার্যকলাপ আসলে এই দ্বন্দ্বকে প্রভাবিত করেছে। ১৮০০ সালের দিকে আর্মেনীয়রা বর্তমানের আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, আজারবাইজান ও পূর্ব তুরষ্কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এসব এলাকায় অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব জায়গাতে আর্মেনীয়রা ছিল সংখ্যালঘু, যেখানে তারা ৭০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে মুসলিম শাসনের (প্রধাণত তুর্কি শাসন) অধীণে ছিল। ঐদিকে রাশান সাম্রাজ্য দক্ষিণ ককেশিয়ায় মুসলিম অধ্যুষীত অঞ্চলে তাদের প্রভূত্ব বিস্তারের প্রয়াস শুরু করে। এই লক্ষ্যে তারা ব্যপক হারে জনগোষ্ঠী স্থানান্তরকে অন্যতম প্রধাণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তারা এতদ অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করে খৃষ্টানদের সেখানে প্রতিস্থাপন করে এই আশায় যে তারা খৃষ্টান রাশান সরকারের অনুগত থাকবে। এই প্রতিস্থাপন নীতি বাস্তবায়নে আর্মেনীয়রা ছিল অন্যতম উপাদান। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্যদের মতোই আর্মেনীয়দের মূল আনুগত্য ছিল ধর্মভিত্তিক। অনেক আর্মেনীয় মুসলিম শাসন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল, তাই তারা খৃষ্টান রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল যেখানে তাদের বিনামূল্যে বসতির জমি দেয়া হচ্ছিল (তুর্কি ও অন্যান্য মুসলিমদের কাছ থেকে অধিকৃত জমি)। তখন থেকে শুরু হয় ব্যপক হারে জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর। এরিভিয়ান প্রদেশে (বর্তমানের আর্মেনিয়ান রিপাবলিক) সংখ্যাগুরু তুর্কি জনগোষ্ঠী আর্মেনীয়দের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। আর উপকূলবর্তী জর্জিয়া, সিরকাসিয়া, ক্রাইমিয়ার মতো অন্যান্য অঞ্চলেও খৃষ্টান জনগোষ্ঠীকে এনে এতদ অঞ্চলে বসবাস করা মুসলিমদের বিতাড়িত করা হয়। আর একারণে ব্যপক মুসলিম জনগোষ্ঠী মারা যান, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা প্রায় এলাকার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের মতো।”

লুইভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোম্যান ইতিহাসের উপর বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ম্যাককার্থি

১৮২৭ থেকে ১৮৭৮ সালের সাম্রাজ্যবাদী রাশানরা ১৩ লক্ষ মুসলিমদের বিতাড়িত করে। পরিনতিতে গড়ে ওঠে আর্মেনীয় ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারষ্পরিক অবিশ্বাস, যা অবশ্য রাশানদের পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেয়। সাম্রাজ্যিক রাশানরা নিজেদের স্বার্থে অটোম্যান সাম্রাজ্যের মধ্যে বাস করা আর্মেনীয় খৃষ্টানদের গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহার করতো। পরিণতিতে সার্বিক অবস্থার ব্যপক অবনতি হয়, আর ১৮৯০ সালে আর্মেনীয় বিপ্লবীদের বিদ্রোহের প্রাক্কালে পূর্ব আনাতোলিয়ার অনেক শহর অধিগ্রহণ করা হয়, ফলে মারা যান অনেক মুসলিম আর আর্মেনীয়। ১৯০৫ সালে রাশান বিপ্লবের সময় তুর্কি আর আজারবাইজানে বসবাসরত আর্মেনীয়দের আন্তগোত্রীয় যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে তাদের মধ্যে পারষ্পরিক অবিশ্বাস আরো বেড়ে যায়।

১৮৯৬ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তুর্কি দূতাবাসের এক ইশতেহারে বলা হয়, “কেন্দ্রীয় অটোম্যান সরকারের প্ররোচনায় নয়, বরং এশিয়া মাইনরে ‘ইসলাম ধ্বংস হোক’ রবে খৃষ্টানদের গগণ-বিদারী আর্তনাদেই ক্রস আর ক্রিসেন্টের যুদ্ধ শুরু হয়।”

এমনকি ১৯০৫ সালের পরেও রাশান পক্ষ অটোম্যান সাম্রাজ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার জন্যে আর্মেনীয় সন্ত্রাসী দলগুলোকে ব্যবহার করতে থাকে। ১৯১২ সালে বিতলিসে নিযুক্ত রাশান কন্সাল জেনারেল মায়েস্কি লিখেছেন, “দাশনাক বিপ্লবী সংঘ আর্মেনীয় ও মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে থাকে, যাতে রাশান হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত হয়।”

যখন তুরষ্ক প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশানদের বিপক্ষে জর্মন মিত্র হিসেবে যোগদান করে, সাথে সাথেই তুর্কি ও আর্মেনীয়দের মধ্যে আন্তঃ-গোত্রীয় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রফেসর ম্যাককার্থির মতে, “আর্মেনীয় বিপ্লবীদের অনেকেই রাশিয়াতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যারা পূর্ব আনাতোলিয়াতে অটোম্যান শহরগুলো দখল করে নেয়। ভ্যান নামক শহরের দখল নিয়ে তারা রাশান দখলদার বাহিনীর আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকে। এর মাঝে আর্মেনীয়রা শহর ও আশেপাশের গ্রামগুলোর প্রায় সব মুসলিমদের হত্যা করে।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ্যদর্শী জর্মন জেনারেল ব্রন্সার্ট ফন শ্যালেন্ডর্ফ বলেন, “যেহেতু সমর্থ প্রায় সব মুসলিমই যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল; আর্মেনীয়রা ওসব এলাকার নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মুসলিমদের উপর চালায় অবর্ননীয় এক হত্যাযজ্ঞ। তারা ঐ এলাকার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সহজ ভাষায় বলতে গেলে মেরে সাফ করে ফেলে। আর্মেনীয়রা ঐসব এলাকায় বর্ণনাতীত বিভীষিকাময় কর্মকান্ড চালায়, যে সম্পর্কে একজন চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে আমি অকপট ভাবে বলতে পারি; যে ওগুলো তুর্কিদের বিরূদ্ধে আনা আর্মেনীয়দের অভিযোগের চাইতেও অনেক বেশী গুরুতর।”

১৯৯৬ সালে মার্কিণ কংগ্রেসের আন্তর্জাতিক বিষয়ক এক সভায় ড. ম্যাককার্থি বলেন, “আমি বিশ্বাস করিনা যে অটোম্যান সরকারের গণহত্যার কোনো অভিপ্রায় ছিলো। আর এমন সিদ্ধান্তে আসার যুগপদ প্রামাণিক ও যৌক্তিক কারণ রয়েছে – যেমন গোপন নির্বাসনের যে সমস্ত নথি পাওয়া যায় তার কোনোটিতেই হত্যার আদেশ দেখা যায়না। উল্টো বরং ঐসব দলিলে নির্বাসনে থাকা আর্মেনীয়দের সর্বোতভাবে রক্ষা করার আদেশ দেখা যায় … আর ইস্তাম্বুল সহ বড় শহরগুলোতে আর্মেনীয়রা অক্ষত অবস্থাতেই থাকে। গণহত্যার ইচ্ছেই যদি সরকারের থাকতো তবে এসব বড় শহরগুলোই ছিলো সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু। সরকারের গণহত্যার ইচ্ছে ছিল কি না এটা নির্ধারণ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে নাৎসি জার্মানীর ইহুদি নিধনের সাথে ঘটনার তুলনা করা। বার্লিনে ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছিল – নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল তাদের উপাসনালয়। আর ইস্তাম্বুলে আর্মেনীয়রা পুরো যুদ্ধ জুড়েই ছিল স্বাধীন – আর তাদের গীর্জাও ছিল খোলা। অন্য শক্ত যুক্তি হিসেবে বলা যেতে পারে যে লক্ষ লক্ষ আর্মেনীয় আরব অঞ্চলে নির্বাসনের মাধ্যমে বেঁচে গেছে। আর গণহত্যার ইচ্ছেই যদি থাকতো তবে বলতে হয় যে তারা আসলে নিয়মমাফিক হত্যা চালাতে পারেনি, কেননা পুরো তিন বছর আর্মেনীয়রা অটোম্যানদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রানাধীন ছিল। এটা অবিশ্বাসযোগ্যও বটে। বরং দেখা গেছে, যে জায়গাগুলোতে অটোম্যানদের নিয়ন্ত্রণ ছিল দূর্বল, সেসব জায়গাতেই বিবাসিত আর্মেনীয়রা বেশী ভুগেছে। সমসাময়িক বিবরন থেকে দেখা গেছে যে, শত শত আর্মেনীয়দের পাহাড়া দেবার জন্যে হয়তো মাত্র দুজন অটোম্যান সৈন্য ছিল। যখন দস্যু ও নানা দলগোষ্ঠী কাফেলাগুলোকে আক্রমণ করে, তখন অনেক আর্মেনীয় হয় সর্বশান্ত নয় নিহত হন। মনে রাখা ভালো যে আক্রমণকারী এই দলগোষ্ঠী আগে আর্মেনীয় ও রাশানদের হাতে নানাভাবে নির্যাতিত হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কী অটোম্যান সরকার দোষী ছিলোনা? অবশ্যই তারা দেশের নাগরকদের নিরাপত্তা না দিতে পারার জন্যে দোষী ছিল। তুর্কি আর কুর্দিরা নিজেদের জীবনের জন্যে যেখানে আর্মেনীয় ও রাশানদের বিরদ্ধে লড়ছে, তখন নাগরিকদের পুরো নিরাপত্তা না দিতে পারার বিষয়টা কিছুটা বোঝা যায়; যদিও নিরাপত্তা না দিতে পারাটা সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে … আর অটোম্যানদের দুর্বলতাকে যেখানে তিরষ্কার করা হচ্ছে, সেখানে আর্মেনীয় কিংবা রাশানদের অধীনে থাকা তুর্কি কিংবা কুর্দিরা কতটূকু নিরাপদ ছিলো এই প্রশ্ন করাটাও যৌক্তিক নয় কী? উত্তর হচ্ছে, আর্মেনীয়দের অধীনে থাকা ভ্যান প্রদেশে চলে তীব্রতম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যেখানে আঁটকে পড়া মুসলিমদের হত্যা করা হয়। বস্তুত দক্ষিণপূর্ব ও পূর্ব আনাতোলিয়ার প্রায় পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠী হয় শরনার্থীতে পরিনত হন নয়তো মারা যান। আর্মেনীয়দের নির্বাসনের মতো এটাও বড় ধরণের মৃত্যুসংখ্যা সহ নির্মম নির্বাসন। তাই যখন নির্বাসনের তথ্যই নথীবদ্ধ করা হচ্ছে, এই নির্বাসনের কথাও বাদ দেয়া উচিত নয়।”

এরপরে প্রফেসর ম্যাককার্থি বলছেন, “একপক্ষ থেকেই সব খারাপ কাজ হয়েছে এমনতরো বদ্ধমূল ধারণাই দূর্ভাগ্যজনকভাবে তুর্কি-আর্মেনীয় সংঘাতের একরৈখিক ব্যাখ্যা তৈরী করেছে। ঐ সময়কার ইতিহাসকে নির্মোহ ভাবে বিশ্লেষণ না করে, সবাই কেবল এক পক্ষকেই সকল দোষে দোষী করে গেছেন। যখন ধরে নেয়া হলো যে তুর্কীরা দোষী, এরপরে শুরু হলো দোষের জন্যে প্রমাণ খোঁজার পালা। দাবী করা ও পরে দাবীর অসারতা প্রমাণ করা, এভাবেই চলতে থাকলো প্রক্রিয়া। দাবী করা হলো যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তালাত পাশা আর্মেনীয়দের হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন, পরে দেখা গেলো দাবীটা মিথ্যা। আর্মেনীয় চার্চের যাযকদের পক্ষ থেকে দাবী তোলা হলো যে, পূর্ব আনাতোলিয়াতে আর্মেনীয়রা সংখ্যাগুরু, কিন্তু পরে দেখা গেলো যে এসব পরিসংখ্যানগুলো মূল সনদগুলোর বরাত দেয়া ছাড়াই তৈরী করা হয়েছে।”

‘আর্মেনীয় যাযক সঙ্ঘ’ থেকে দাবী করা হয় যে তাদের পরিসংখ্যান অনুসারে নাকি পূর্ব আনাতোলিয়াতে আর্মেনীয়রাই সংখ্যা গরিষ্ঠ ছিল। কিন্তু পরে দেখা যায় যে এই পরিসংখ্যান কোনো রকম সুত্র ছাড়াই প্যারিসের বসবাসরত এক লেখক বানিয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডা অফিস থকে প্রকাশিত চিঠির বরাত দিয়ে তুর্কি অপরাধের জোর দাবীও তোলা হয়; কিন্তু পরে দেখা যায় যে ঐ চিঠিগুলো আসলে খৃষ্টান মিশনারী ও আর্মেনীয় বিপ্লবীদের দ্বারা পাঠানো হয়, যাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এও দাবী করা হয় যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তুরষ্কে স্থাপিত কোর্ট মার্শালে প্রমাণ হয়েছে যে যুদ্ধকালীণ সময়ে তুর্কিরা গণহত্যায় নিয়োযিত ছিলো, যদিও নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে গণহত্যার অভিযোগ ছিল লম্বা তালিকাতে থাকা অনেক অপঅরাধের মাত্র একটি এবং সে অভিযোগগুলোও ব্রিটিশ দখলদার বাহিনীর অনুগত যুদ্ধ পরবর্তী তুর্কি সরকারের আমলে করা – আর সেই লম্বা অপরাধের তালিকাতে ছিল প্রমাণিত মিথ্যা অভিযোগ সহ সবকিছু যা মূলত ব্রিটিশ দখলদার শক্তিকে খুশী করবে। 

বর্তমানের আর্মেনিয়া ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সামগ্রিক মানচিত্র।

“এমনতরো দাবীর সমস্যা হচ্ছে যে, অভিযোগগুলোকে ব্যপক প্রচার দেয়া হয় যেখানে অভিযোগ গুলোর খণ্ডন কিন্তু সাধারণত ইতিহাসবিদদের কাছে আছে। উদাহরণস্বরূপ, জনসংখ্যার পরিসংখ্যানের কথাটা বলা যায়;  যেখানে জাতিগত মুসলিমরা আর্মেনীয়দের চাইতে সংখ্যায় তিন গুন বেশী ছিল, সেখানে প্রায় সবাই ভাবেন যে বর্তমান আর্মেনিয়া অঞ্চলে ঐ সময়ে আর্মেনীয়রা সংখ্যা গরিষ্ঠ ছিল। নামবিহীন সুত্র থেকে পাওয়া আর্মেনীয়দের মৃত্যুর খবরই ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডা মিশন বারংবার ছাপতে থাকে, অথচ সেই সুত্র ছিল আদতে আর্মেনীয় বিপ্লবী সংঘ নিজেই। ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডা মিশনই যে নৈমিত্তিক ভাবেই যে এসব সাক্ষ্যপ্রমাণ তৈরী করতেন তা ইতিহাসবিদগণ প্রমাণ করেছেন। ব্রিটিশ শক্তির ইস্তাম্বুল অধিগ্রহণের ঐ সময়ের আপাতঃ প্রমাণ সম্পর্কে যারা অভিযোগ তোলেন, তারা প্রয়শই এটা বলতে ভুলে যান যে অটোম্যান দলিলাদির সার্বিক নিয়ন্ত্রক ব্রিটিশরাই কিন্তু আর্মেনীয়দের বিরূদ্ধে পরিকল্পিত গণহত্যার কোনো প্রমাণ যে পাওয়া যায়নি তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।”

বলে রাখা ভাল যে, ড. ম্যাককার্থি আর্মেনীয় গণহত্যার হেত্বাভাসের দিকে ইঙ্গিত করা একমাত্র বিশেষজ্ঞ নন। আরো অনেক ইতিহাসবিদই আছেন যারা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে গণহত্যার অভিযোগ অতিমাত্রায় পক্ষপাতদুষ্ট। এদের মধ্যে রয়ছেন, বার্নার্ড লুইস (বিগত), এনভার জিয়া কারাল (আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়), সালাহি আর. সোন্যাল (ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও গণ আন্দোলক), ইসমাঈল বিনার্ক (ডিরেক্টর অটোম্যান আর্কাইভ, আঙ্কারা), সিনাসি ওরেল (ডিরেক্টর, অটোম্যান অর্মেনীয় দলিলাদির শ্রেণীবিন্যাস সংস্থা), কামুরান গুরুন (সাবেক কূটনীতিক) ও মিম কেমাল ওকি। উনারা ও আরো অনেকেই বলেছেন যে, জেমস ব্রাইস ও আর্নল্ড জে. টয়েনবির লেখা “ব্লু বুক” (অটোম্যান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয়দের প্রতি আচরণ, ১৯১৫-১৯১৬) পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ব্রিটিশ ও ফরাসী গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহ করা মিথ্যা তথ্যের উপর ভিত্তি করে লেখা বইটি মূলত তাদের প্রোপাগান্ডারই অংশ, যা দিয়ে একদিকে যেমন তুরষ্কের ভাবমুর্তি নষ্ট করা যাবে, অন্যদিকে তেমনি পরাভূত অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিশাল অংশে তাদের কলোনিয়াল শক্তি প্রতিষ্ঠাকে বৈধতা দেয়া যাবে।  

তুরষ্কের বিরুদ্ধে তিলকে তাল করা কুৎসাপূর্ণ এসব অভিযোগের সাগরে হারিয়ে গেছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর হত্যার খতিয়ান। অটোম্যান দালিলিক হিসাব মতে ৫১৭,৯৫৫ জন বেসামরিক মুসলিম ঐ সময় আর্মেনীয় বিপ্লবী সঙ্ঘের হাতে প্রাণ হারায়। আর হিসেবটার মধ্যে ফরাসী আর্মেনীয় সৈন্যদল, ব্রিটিশ ও রাশান সমর্থিত আর্মেনীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের হাতে নিহত মুসলিমদের ধরা হয়নি। আনাতোলিয়ান ইতিহাস গবেষণা কেন্দ্রের মেহমেত আদভদিজেরের ভাষায়, “সে সময় রাশান সৈন্যদলের মদদে আর্মেনীয় দঙ্গল মুসলিম তুর্কিদের উপর গণহত্যা চালায়। ঐ সময়ে ইঙ্গ-রাশান শক্তি পূর্ব আনাতোলিয়াতে আর্মেনিয়ার মানচিত্র আঁকে। ঐ মানচিত্রের স্বপ্নে বিভোর আর্মেনীয় দঙ্গল তখন দখলদার শক্তির যোগসাজশে ভ্যানে সোয়া দুই লাখ, কার্স ও তার উপশহর গুলোতে ৪৫ হাজার, বিতলিস ও তার আশেপাশে ৬৮ হাজার, ইরজিরাম ও তার পার্শবর্তী এলাকায় ৩০ হাজার, মুশ ও তার আশেপাশে ২১ হাজার, এবং অগ্রিতে ১৪ হাজার তুর্কি মুসলিম হত্যা করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, ৫১৭,৯৫৫ মুসলিম তুর্কিকে হত্যা করে সমহিত করা হয়।” বিশ্বস্ত সুত্রগুলো থেকে পাওয়া সংখ্যাগুলো তূলনা করলে সহজেই দেখা যায় যে সচরাচর তোলা দাবীর বিপরীতে বরং আর্মেনীয়দের হাতেই বেশী মুসলিম মারা যান।

সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সভার এক পেপারে প্রফেসর ম্যাককার্থি লেখেন, “আমরা এখন জানি যে সুবিখ্যাত হিটলারের উক্তির মতোই তালাত পাশার গণহত্যার আদেশটিও আদতে জালিয়াতি। বরং ঐ সময়কার অটোম্যান সরকারের যে সমস্ত দলিলাদি পাওয়া যায় তাতে স্থানান্তরিত আর্মেনীয়দের সুরক্ষা করার সরকারী মনোভঙ্গি ব্যাক্ত হতে দেখা গেছে।”

নির্মোহ ইতিহাসবিদদের প্রায় সবাই সর্বোসম্মত ভাবেই রায় দিয়েছেন যে ১৯১৫ সালে আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে যা ঘটেছিল তা গণহত্যা নয়। একদিকে যেমন আর্মেনীয়দের নির্মূল করার কোনো সরকারী পরিকল্পনা ছিলোনা, তেমনি অন্যদিকে স্থানান্তর অভিবাসনের সময় মারা যাওয়া আর্মেনীয়দের প্রকৃত সংখ্যা যা দাবী করা হয় তার চাইতে অনেক কম।

আর্মেনিয়া পৃথিবীর প্রাচীনতম খৃষ্টান রাষ্ট্র। বলা হয় যীশু খৃষ্টের দু’জন অনুসারী ৪০ থেকে ৬০ অব্দে এখানে খৃষ্টান ধর্ম নিয়ে আসেন। পবিত্র নগরী জেরুসালেমেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। জেরুসালেমের পুরাতন শহরে প্রধাণ তিনটি ধর্মের লোকদের জন্যে ঐতিহাসিকভাবে তিনটি কোয়ার্টারের পাশাপাশি রয়েছে আর্মেনীয় কোয়ার্টার। জেরুসালেমে এখনো প্রাচীন আর্মেনীয় চার্চের ২ হাজারের বেশী লোকজন থাকেন। শত শত বছর ধরে আর্মেনীয়রা মুসলিম শাসনের অধীনে থাকলেও তারা প্রায় সবাই খৃষ্টাণ রয়ে গেছেন। বর্তমান আর্মেনিয়ায় খৃষ্টান ৯৭% আর মুসলিম রয়েছে ০.১% এর মতো (১০০০ জন)। নীচে আর্মেনিয়ার একমাত্র মসজিদ 

আর দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে প্রোপাগান্ডায় কাজ হয়, আর আজকাল তাই গণহত্যাও জায়নিস্টদের কল্যাণে একটা লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিষয়টা এতটাই গভীর যে কিছু কিছু দেশে গণহত্যাকে সন্দেহ করলে কিংবা এ সম্পর্কে প্রশ্ন তুললে তাকে শাস্তি দেয়া হতে পারে। আর্জেন্টিনা, সুইজারল্যান্ড আর উরুগুয়েতে গণহত্যা অস্বীকার করাকে শাস্তিযোগ্য বলে আইন পাশ করা হয়েছে। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন “গণহত্যাকে অস্বীকার করা কিংবা এই সম্পর্কে উস্কানী দেয়াকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে” একটা আইন তৈরী করেছে।

মজার বিষয় হচ্ছে ঢালাও আর অন্ধভাবে অন্যদের দোষারোপ করা পশ্চিমা বিশ্ব – যাদের প্রায় সবাই একসময় কলোনিয়াল শক্তি ছিল –  তাদের নিজেদের কলোনীগুলোতে করা গণহত্যার লজ্জাজনক ইতিহাসকে এড়িয়ে চলে। যেমন, ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সালে স্বাধীনতাকামী ১০ লক্ষাধিক আলজেরীয়দের হত্যা করার ইতিহাস কিন্তু সুবিধামতো ফরাসী সরকার ভুলে যায়। আর আগে যেভাবে বলা হলো, ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে প্রায় দেড় কোটি বাঙ্গালী হত্যার ইতিহাস হচ্ছে জঘণ্যতম এক গণহত্যার ইতিহাস। একইভাবে আছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাতে সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ কোটি অশ্বেতাঙ্গ স্থানীয়দের হত্যা করার ইতিহাসও (আছে বিগত শতাব্দীর নেটিভ আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও তাসমানিয়াতে এ্যবোরজিনি আদিবাসী গণহত্যার ইতিহাস, আর আমাদের সময়ে ঘটে যাওয়া চেচেন, আফগান ও ইরাকীদের হত্যার ইতিহাস তো আছেই); অতএব, গণহত্যার কথা বরং যত কম বলা যায়, ততই ভালো।

নিজেদের গণহত্যার অপরাধের জঘণ্য ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে তুর্কিদের উপর সেই একই নোংরা দাগ লাগানোর অপচেষ্টা তাই আমার কাছে নির্লজ্জ ভণ্ডামী ছাড়া আর কিছু নয়।

সে সময়ে ঘটা আর্মেনীয়দের মৃত্যু আসলেই বেশ বিতর্কিত বিষয়; আর তাই জোরপূর্বক কারুর কন্ঠরোধ না করে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের জন্যে এটা গবেষকদের উপর ছেড়ে দেয়া উচিত। নির্বাচনী মৌসুমে ভালো কিছু না দিতে পারা এহেন ব্যর্থ রাজনীতিবিদরা তাই স্পর্শকাতর বিষয়ের সুযোগ নিয়ে নিজেদের ভোটের বাক্স ভারী করার নীতি গ্রহণ করেছে; যা নিতান্তই দুঃখজনক। আর হীণ স্বার্থপর এই খেলাতে বলী দেয়া হচ্ছে প্রকৃত সত্যকে। এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য! সারকোজি ও তার স্বগোত্রীয় এহেন দেউলিয়া রাজনীতিবিদরা তাই আদতেই বিশ্ব-বেহায়া!

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!