আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর: অধিকার হরণ নাকি অর্জন?

by sultan

সাইফুল্লা লস্কর | (টিআরটি বাংলার সৌজন্যে):
১০ ই জুলাই, ২০২০, অবসান দীর্ঘ ৮৬ বছরের। আবার আযানের সুমধুর ধ্বনিতে মুখরিত হলো ইস্তানবুলের ফাতিহ জেলায় অবস্থিত ৪৮২ বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ আয়া সোফিয়া। অশ্রুসজল বহু মুসলমান সাক্ষী থাকলেন ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের। জাদুকর রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের হাতের ছোঁয়ায় জাদুঘর আবার ফিরে পেলো তার পুরনো স্বরূপ। স্বার্থকতা লাভ করলো মুসলিম বিশ্বের বহু দিনের লালিত স্বপ্ন।
তবে মুসলিম জাহানের এই আনন্দের দিনেও অনেকের মনে একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে আমাদের অধিকার অর্জন করতে গিয়ে কোথাও অন্য কারো অধিকার আমরা হরণ করলাম না তো?

হাজারো নিষ্পেষণ এবং অত্যাচারের শিকার হলেও মুসলিম উম্মাহ কোনোদিন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে করো অধিকার হনন করেনি। বরং বারে বারে অন্যের অধিকারের জন্য সরব হতে দেখা গিয়েছে মুসলিম জগৎকে।

হাজারো নিষ্পেষণ এবং অত্যাচারের শিকার হলেও মুসলিম উম্মাহ কোনোদিন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে করো অধিকার হনন করেনি। বরং বারে বারে অন্যের অধিকারের জন্য সরব হতে দেখা গিয়েছে মুসলিম জগৎকে। তাই এবারেও প্রকৃত ইতিহাসের সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাবে অনেকেই এই খুশির মুহূর্তেও অপরের আবেগ ও অনুভূতির কথা ভেবে এই ঘটনার প্রতিবাদ করছেন অনেক মুসলমান। কারণ যে জীবন ব্যাবস্থা এবং যে মহামানবের অনুসারী এই ১৬০ কোটি বিবেক তা শেখায় সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত করতে। তবে নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে আমাদের এবং এক্ষেত্রে সবাইকে জানা উচিত প্রকৃত ইতিহাস যার ফলে বিশ্ব বাসীকে আমরা সত্য সম্পর্কে অবহিত করে সমালোচকদের যথাযোগ্য জবাব দিতে পারি।

প্রেক্ষাপট :

নিজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে একটি মসজিদে গত বছর ১৫ ই মার্চ ব্রেনটন টারান্ট নামক এক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী সেমি অটোমেটিক রাইফেল এবং স্টান গান নিয়ে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে হত্যা করে ৪৯ জন নিরীহ মুসলমানকে। পরবর্তীতে এই সন্ত্রাসীদের একটি ইস্তেহার পাওয়া যায় পুলিশের তদন্তে যাতে লেখা ছিল তাদের মুসলিম বিদ্বেষী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে। সেখানে ইস্তানবুলের কথাও লেখা ছিল। তারা লেখে, কনস্তুন্তুনিয়া(বর্তমান ইস্তানবুল) মুসলমানরা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে। এই শহরে প্রবেশ করে মুসলিম শাসনের উৎখাত, সমস্ত মসজিদের ধ্বংস এবং আয়া সোফিয়া আবার মুসলিমদের থেকে মুক্ত করে খ্রিস্টানদের দখলে নেয়া হবে। যার জবাবে তৎকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছিলেন এই মুসলিম বিদ্বেষী সন্ত্রাসীদের সমস্ত ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেছিলেন যদি ভবিষ্যতে নীল মসজিদে মুসুল্লির সংখ্যা বেড়ে যায় তাহলে আয়া সোফিয়া মসজিদে রূপান্তর করা হবে।

পরবর্তীতে এই সন্ত্রাসীদের একটি ইস্তেহার পাওয়া যায় পুলিশের তদন্তে যাতে লেখা ছিল তাদের মুসলিম বিদ্বেষী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে। সেখানে ইস্তানবুলের কথাও লেখা ছিল। তারা লেখে, কনস্তুন্তুনিয়া(বর্তমান ইস্তানবুল) মুসলমানরা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে।

প্রকৃত ইতিহাস ইতিহাস :

আয়া সোফিয়ার প্রতিষ্ঠা ও তারপর এক কালে গ্রীক অর্থডক্স খ্রিস্টানদের ক্যাথিড্রাল চার্চ আয়া সোফিয়া বা চার্চ অফ হোলি উইজডম এর বর্তমান স্থাপনাটি বাইজান্টাইন শাসক প্রথম জস্টিনিয়ান এর নির্দেশে ৫৩২ থেকে ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি হয় বর্তমান তুরস্কের রাজধানী ইস্তানবুল শহরে। ইস্তানবুলের আকাশ ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মাহমুদের সৌজন্যে প্রথমবারের মতো পবিত্র আযানের ধ্বনিতে মুখরিত হওয়ার আগে আয়া সোফিয়া বিশ্বের মধ্যে খ্রিস্টানদের সব থেকে বড়ো চার্চ ছিল। ছিল বহু খ্রিস্টানের বিশ্বাস এবং আস্থার প্রতীক।
রাজনৈতিক ভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই চার্চটি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে থেকে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় প্রায় ৬০ বছর রোমানদেরও দখলে থাকে। মুসলমানদের ইস্তানবুল বিজয় ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ শে মে সকালে মুসলমানদের হাতে পতনের পর ইস্তানবুলের তৎকালীন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতীক আয়া সোফিয়াতেই সবাই একত্রিত হয় মুসলমানদের হাত থেকে বাঁচতে ঐশ্বরিক সাহায্যের প্রত্যাশায়।

(সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ রহঃ এঁর আয়া সোফিয়াকে ওয়াক্বফ মালিকানার প্রমাণ)

সেখানেই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগের সব রকম আশ্বাস দান করেন সুলতান মাহমুদ। তিনি ক্ষমা করে দেন আত্মসমর্পণ করা সব খ্রিস্টানদের এবং তাদের অনেক ধর্মীয় স্থাপনা যা যুদ্ধের সময় গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল তা মেরামত করতে সাহায্য প্রদান করেন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। কিন্তু তিনি আয়া সোফিয়ার স্বত্ব কিনে নেয়ার জন্য তৎকালীন খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে নিজের খরচে আয়া সোফিয়া ক্রয় করেন এবং তা ওয়াকফ সম্পত্তি রূপে সমর্পণ করেন। তিনি আয়া সোফিয়াতে খ্রিষ্টান বৈশিষ্ট্যগুলো অপসারণ না করে সেগুলোকে মুসলিম বৈশিষ্ট্যের চাদরে আবৃত করে দেন। যেমন মিনার তৈরি করেন। বিভিন্ন মূর্তি এবং পেইন্টিং গুলি বিভিন্ন কুরআনের আয়াত সংবলিত কাপড় দ্বারা ঢেকে দেন। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তথ্য এবং প্রাণের সাহায্যে তুরস্কের সর্বোচ্চ আদালত রায় প্রদান করে আয়া সোফিয়া কে মসজিদে রূপান্তরিত করার সপক্ষে।

কিন্তু তিনি আয়া সোফিয়ার স্বত্ব কিনে নেয়ার জন্য তৎকালীন খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে নিজের খরচে আয়া সোফিয়া ক্রয় করেন এবং তা ওয়াকফ সম্পত্তি রূপে সমর্পণ করেন।

কামাল আতাতুর্কের হাতে মসজিদ থেকে মিউজিয়াম
প্রথম বিশ্ব যোদ্ধের পর পরাজিত তুরস্কে খিলাফতে ওসমানিয়ার ধ্বংস্তুপের ওপর ১৯২৩ সালে পশ্চিমাদের অনুগত কামাল আতাতুর্কের হাত ধরে গজিয়ে ওঠে শিকড় বিহীন মুসলিম বিদ্বেষী সেক্যুলার রাষ্ট্র। নিষিদ্ধ করা হয় আযান, আরবী এবং ফারসি শিক্ষা। বন্ধ করা হয় অসংখ্য মসজিদ এবং মাদ্রাসা। তুর্কিদের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান লাভ করা আয়া সোফিয়া বন্ধ করার চেষ্টা ১৯২৩ সালেই করেছিলেন তিনি কিন্তু মন্ত্রিসভার অনেকে এর সমর্থন না করায় তিনি তখনকার মতো তিনি সিদ্ধান্ত রদ করেন।

তবে জানা যায় ১৯৩৫ সালে এক মার্কিন ফটোগ্রাফার আয়া সোফিয়ার বিষয়ে কথা বলতে আতাতুর্কের সঙ্গে কথা বলেন। পরের দিন থেকেই আয়া সোফিয়ার গম্বুজ গুলো আর শুনতে পায়নি আযানের ধ্বনি এবং মুসূল্লিদের পদধ্বনি। তিনি লিখেছেন, এদিন আয়া সোফিয়া ছিল মসজিদ, ঠিক তার পর দিন সকাল থেকে তা হয়ে যায় এক মিউজিয়াম। ১৯৩৫ সালে মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যদের মতানুসারে তিনি পি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। যার ফলে তার এক জঘন্য ইচ্ছা বাস্তবতার মুখ দর্শন করে।

সমালোচকদের জবাব :

তুরস্কের এই পদক্ষেপের পর পরই এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী মাইক পম্পেও, রাশিয়ার অর্থডক্স চার্চ, গ্রীস ইত্যাদি দেশ এবং সংস্থা গুলি। সমালোচনার ঝড় উঠেছে টুইটার এবং ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া গুলোতে। অনেক মুসলিমদের ও দেখা কাছে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে।
তবে ইসলামের রীতি বলে যা একবার মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তা সর্বদা মসজিদ হিসেবেই থাকে। তাই যেটা ৪৮২ বছর মসজিদ ছিল তা অবশ্যই মসজিদ এবং এখানে ইবাদত করা বিশ্ব মুসলমানদের অধিকার।
বেশিরভাগ সমালোচকদের বলতে শোনা যাচ্ছে যে এটি আসলে একটি খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় স্থাপনা তাই এটাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে মসজিদে রূপান্তর করা তাদের অধিকার হরণ করা। কিন্তু এ কথা সত্য নয়।

কারণ খ্রিষ্টান সম্প্রদায় অনেক আগে আনুষ্ঠানিকভাবে এর স্বত্ব বিক্রি করেছিল মুসলমানদের কাছে তাহলে কিভাবে এটা খ্রিষ্টান স্থাপত্য হতে পারে এত দিন পরে?

বর্তমানে ইউরোপ এবং আমেরিকাতে বহু চার্চ প্রার্থনাকারী দের অভাবে বিক্রি করা হচ্ছে যা অনেক সাধারণ মানুষ কিনে নিচ্ছেন। কেউ এগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছেন আবার তাদের কেউ এটাকে বসবাসের জন্য বা কেউ অফিস হিসেবেও ব্যাবহার করছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্ট অনুসারে ইংল্যান্ডে এখন প্রতি বছর ২০ টি করে চার্চ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। জার্মানি তে গত এক দশকে ৫১৫ টি চার্চ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেমান করা হয়েছে শুধু ইউরোপে আগামী ৪ বছরে বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে প্রায় ৭০০ তোর বেশি চার্চ এবং আগামী এক দশকে এই সংখ্যা পৌঁছতে পারে ১৫০০ এ।

স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেসরকারি সংস্থা বা ব্যাক্তি এগুলো কিনেছে বা ভবিষ্যতে কিনবে। কিন্তু ১০০ বছর পর কেউ যদি এটা চার্চ বলে এর স্বত্ব দাবি করে এটা কতটা যৌক্তিক হবে তা সমালোচকদের প্রথমে জবাব দেওয়া উচিত।

এই সমালোচকদের পরিচিতি :

এই সমালোচকদের বেশিরভাগ স্পেনে মুসলিমদের এপ্রিল ফুল তত্ত্বের সমর্থক এবং প্রশংসক। দক্ষিণ স্পেনের কর্ডোভা গ্রানাডা সহ বিভিন্ন জায়গায় ৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে ছিল মুসলমানদের ন্যায় এবং সম্মতার ওপর ভিত্তি করে চলা রাজত্ব। সেসময় সেখানে ছিল অন্তত ৭০০ টি বৃহৎ আয়তনের মসজিদ কিন্তু বর্তমান স্পেনে মাত্র ১৩ টি বৃহৎ মসজিদ বর্তমান। তুরস্ক যাদের ব্যাপারে খ্রিস্টানদের অধিকার হননের অভিযোগ আনা হচ্ছে সেখানে এখন শুধু ইস্তানবুল শহরে ১২৩ টি চার্চ আছে যার মধ্যে অনেকগুলো বহু পুরনো সময়ের।

সমালোচকদের একটা বড়ো অংশ ভারত থেকে যারা “মন্দির ওখানেই গড়বো” স্লোগান দিয়ে মিথ্যা দাবির মাধ্যমে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে সেখানে রাম মন্দীর তৈরি করতে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে এই শ্রেণীর মানুষগুলো নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করলেই যথাযথ উত্তর পাবে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন থাকবেনা।

0 মন্তব্য
1

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!