ইতিহাসে প্রথমবার ব্রিটিশ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ডুবিয়েছিলো উসমানীয় সৈন্যরা

by sultan

সাল ১৯১৬, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন চরম আকার ধারন করেছে। অক্ষশক্তি হিসেবে রয়েছে উসমানীয় সাম্রাজ্য বা তুরস্ক, জার্মানি ও অন্যান্য রাস্ট্র ও মিত্রশক্তি হিসেবে রয়েছে ফ্রান্স,ব্রিটেন ও অন্যান্য রাস্ট্র। ফ্রান্স তুর্কি বাহিনীকে আক্রমন করার জন্য উদগ্রীব। তুরস্ক কে ধরাশায়ী করতে হলে তুরস্কের ভূমির নিকটে কোথাও ঘাটি গাড়তে হবে। তাই আর সে লক্ষেই ১৯১৬ সালের ২০ ডিসেম্বর,তুরস্কের দক্ষিন-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত গ্রীক দ্বীপ কাস্টেলোরিজো (Kastellorizo) দখল করে নেয় ফরাসী সৈন্যরা। ফরাসী সৈন্যদের পরীকল্পনা অনুযায়ী এ দ্বীপ টিকে উসমানীয় সাম্রাজ্য বা তুরস্কের বিরুদ্ধে ঘাটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ফরাসী কমান্ডার অবস্থান পাকাপোক্ত করার জন্য একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এর প্রয়োজন অনুভব করলেন, যা মূলত তখনকার দিনে সি প্লেন ক্যারিয়ার হিসেবে পরিচিত ছিলো। আর এ লক্ষ্যেই ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ক্যারিয়ার HMS Ben-My-Chree রওনা দেয় সে ফ্রান্স কর্তৃক দখলকৃত গ্রীক দ্বীপটির দিকে,দুই দেশের ই চিরশত্রু উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে।

HMS Ben-My-Chree যার মানে হলো Women of my heart বা প্রেয়সী ছিলো তৎকালীন পরাশক্তি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি সি প্লেন ক্যারিয়ার যা ক্যারিয়ারের হ্যাঙ্গারে সি প্লেন রাখত। জাহাজ টির ওজন ছিলো প্রায় চার হাজার টন। ৪-৬ টি এয়ারক্রাফট/সি প্লেন বহন করতে পারত এ ক্যারিয়ার টি। ১১৮ মিটার দীর্ঘ এ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারটিতে ২৫০ জন ক্রু এর প্রয়োজন হতো। ২য় বিশ্বযুদ্ধে এটি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এটিকে মিসরের উপকূলে ট্রান্সফার করা হলে এটি ইস্ট ইন্ডিজ ও মিসরের সি প্লেন ক্যারিয়ার স্কোয়ান্ড্রনের ফ্ল্যাগ শিপে পরিনত হয়। এ শিপটির মূল দায়িত্ব ছিলো মিসরের সিনাই ভ্যালি ও ফিলিস্তিনে তুর্কী সেনাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা। ফরাসী কমান্ডারের সাহায্যের আবেদন এলে মিত্রশক্তির অংশীদার হওয়াতে HMS Ben-My-Chree তুরস্কের দক্ষিন উপকূলের ফ্রান্স অধিকৃত গ্রীক দ্বীপটির দিকে রওনা করে। ১১ জানুয়ারী ১৯১৭ সাকে এটি সে দ্বীপে পৌছায় ও নোঙর করে। আর সেদিন ই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার কে ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

এ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার টি ডুবে যাওয়ার পিছনে মিত্রশক্তির গোয়েন্দা ব্যর্থতাও ব্যাপক ভাবে দায়ী। ফ্রান্স যখন গ্রীক দ্বীপটি দখল করে নেয় তখনই তুরস্ক বুঝে যায় যে সামনে এক ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে। উসমানীয় সেনাবাহিনী খুব গোপনে সেখানে এক ব্যাটারি আর্টিলারি মোতায়েন করে ( যাকে আমরা কোস্টাল ডিফেন্স ও বলতে পারি )। মোট চারটি ১৫৫ মি.মি কামান ও ১২ টি ৭৭ মি.মি কামান মোতায়েন করা হয়েছিলো। আর এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত তুর্কী বীর মুস্তাফা এরতুগ্রল। এ আর্টিলারী ইউনিটের ব্যাপার টি মিত্রপক্ষের গোয়েন্দারা ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি।

মুস্তাফা এরতুগ্রল উসমানীয় খিলাফাতের সেনাবাহিনীর একজন আর্টিলারী ক্যাপ্টেন ছিলেন। ১ম বিশ্বযুদ্ধে তিনি বেশ কয়েকটি বেশ কয়েকটি মিত্রবাহিনীর জাহাজ ধ্বংস করে বিভিন্ন খেতাব অর্জন করেন। যাহোক মূল ঘটনায় ফিরে আসা যাক। ব্রিটিশ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার দ্বীপে নোঙর করার ২ ঘন্টা পর মুস্তাফা এরতুগ্রল তার আর্টিলারী ইউনিটকে একযোগে আক্রমনের নির্দেশ দিলেন। এরতুগ্রল নিজেই এগিয়ে যান ও আল্লাহু আকবার রণহুংকার এ কামান দাগেন। তার নিজের ছোড়া প্রথম শেলই গিয়ে ক্যারিয়ার টির স্টিয়ারিং এ গিয়ে পড়ে। ফলে এটি কার্যত অকেজো হয়ে যায়। এরপর তুর্কি আর্টিলারি ব্যাটারি হতে ক্রমাগত গোলাবর্ষণ হতে থাকে যা ক্যারিয়ারটির হ্যাঙ্গার ও অন্যান্য অংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। বোমাবর্ষন শুরুর ৪০ মিনিট পর ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন সবাইকে ক্যারিয়ার ত্যাগের নির্দেশ দেয় ও লাইফবোট দিয়ে কোনমতে পালিয়ে গিয়ে ব্রিটিশ ক্রু রা তাদের জীবন বাচায়। একপর্যায়ে গোলাবর্ষণ এর ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ডুবে যায় অর্থাৎ তুর্কী অপারেশন সফল হয়।

পরবর্তীতে এ ক্যারিয়ার টিকে রিপেয়ারের অনেক চেস্টা করা হলেও ১৯২৩ সালে এটিকে বাতিল ঘোষনা করে Scrap করে ফেলা হয়।

সংগ্রহে-frontlinebd



0 মন্তব্য
1

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!