ইলমুদ্দিন: নবীপ্রেমে জীবন উৎসর্গকারী দুঃসাহসী তরুন শহীদ

by sultan

গাজি ইলমুদ্দিন শহিদ লাহোরের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ৪ ডিসেম্বর ১৯০৮ তারিখে জন্মগ্রহণ করে। তার বাবার নাম তালেমন্দ। পেশায় কাঠমিস্ত্রি। লাহোরে এবং তার আশপাশে সততা এবং দক্ষতার কারনে তাদের ভালো সুনাম ছিলো। সম্মানের সাথেই দিনাতিপাত করছিলেন। খুব বড় হওয়ার এবং অনেক সম্পদধারী হওয়ার স্বপ্ন ছিলো না। আর দশটি পরিবারের মতো স্বাভাবিকভাবেই জীবনের ধাপগুলো অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা ছিলো। সেসময়ে শিশুরা মসজিদ থেকেই প্রাথমিক জ্ঞানার্জন করতো। তালেমন্দ তার ছেলেকেও কোরআন শেখার জন্য মসজিদে পাঠিয়েছিলেন।  গাজি ইলমুদ্দিন কিছুদিন সেখানে যাতায়াত করে। কিন্তু অধিক বিদ্যাবুদ্ধি অর্জন করা আর তার নসিবে জোটে না। কুদরত তাকে হয়তো গতানুগতিকতার বাইরে অন্য কোনো মিশনের জন্য প্রস্তুত করছিলো। ইলমুদ্দিনের ভাই মুহাম্মাদুদ্দিন লেখাপড়া করে সরকারি চাকরি লাভ করে। অপরদিকে ইলমুদ্দিন বাবার হাত ধরে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পেশায় আত্মনিয়োগ করে। বাবার মতো সেও একজন ভালো কাঠমিস্ত্রি হয়। ইলমুদ্দিন বাবার সাথে কাজের প্রয়োজনে লাহোরের বাইরেও বিভিন্ন সময়ে গমন করতো।

ইলমুদ্দিন এবং মুহাম্মাদুদ্দিনের মধ্যে বেশ সখ্যতা ছিলো। ভাই-ভাইয়ের মধ্যে এমন প্রগাঢ় ভালোবাসা খুব কমই নজড়ে পড়ে।  একবারের ঘটনা, ইলমুদ্দিন তখন বাবার সাথে শিয়ালকোটে গিয়েছে। এদিকে মুহাম্মাদুদ্দিন ভাইয়ের ব্যাপারে দুঃস্বপ্ন দেখে। দুঃস্বপ্ন দেখে অস্থির হয়ে মুহাম্মাদুদ্দিনও শিয়ালকোটে গিয়ে পৌঁছে। মুহাম্মাদুদ্দিন যখন বাবার ঠিকানায় পৌঁছে, তখন ইলমুদ্দিন খাটে বসা ছিলো। ভাইকে দেখে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। এভাবে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়। তালেমন্দ মুহাম্মাদুদ্দিনকে বসতে বলেন। মুহাম্মাদুদ্দিন স্বপ্নে ভাইকে যখম হতে দেখেছিলো। এবার সে লক্ষ করে দেখে, বাস্তবেই ইলমুদ্দিন যখম। হাতে পট্টি বাঁধা। কাজে তখন তো মাত্র হাতেখড়ি হচ্ছে। তাই অসতর্কতায় আঘাত পেয়ে হাত যখম হয়েছে। সেখানে একদিন অবস্থান করে বাবার নির্দেশে পরবর্তী দিন মুহাম্মাদুদ্দিন লাহোরে ফিরে আসে।

ইলমুদ্দিন লেখাপড়া শিখেনি ঠিক, তবে পারিবারিকভাবেই মনুষ্যত্বের দীক্ষা নিয়েছে। সততা সত্যবাদিতা অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়ার মানসিকতা অনুগ্রহকারীর জন্য জীবনোৎসর্গ করার চেতনা ইত্যাদি বিষয় বাবা-মা’র দৈনন্দিন আচার-রীতি থেকেই তার ভেতরে শেকড় গেঁড়ে নেয়। ইলমুদ্দিন কখনও চিল্লায় যায়নি ঠিক, কখনও হজ-উমরাও করেনি, কখনও খানকাহয়ও যাতায়াত করেনি, আর না কখনও রাযি-কাশশাফ অধ্যয়ন করেছে, মানতিক-ফালসাফা-আসরারে শরিয়ত শিখেছে, না কখনও শায়খের সাথে সম্পর্ক গড়ে দীর্ঘ আমল করেছে, না কখনও মসজিদে গাশত করেছে। কিছুই সে করেনি। দীনি বিষয়ে বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যই সে অর্জন করেনি। তার তো সম্বল ছিলো শুধু এক কালিমা। যে কালিমা সে পড়তো। যে কালিমাকে সে ভালোবাসতো। যে কালিমা থেকে সে দুই মহান সত্তাকে অনুভব করতো। আল্লাহ এবং তার রাসুলকে ভালোবাসতো। সে হেকমত-মাসলাহাত বুঝতো না। তার ভেতরে জযবা ছিলো। দীনি জযবা। আল্লাহ এবং তার রাসুলকে ভালোবাসার জযবা। এজন্যই তো তার স্মরণে আল্লামা ইকবাল বলেন—

اسی گلاں ای کر دے رہ گئے تے تر خاناں دامنڈابازی لے گیا

অপর এক কবিতায় আল্লামা ইকবাল বলেন—

عشق کی اک ہست نے طے کر دیا قصہ تمام

اس زمین و آسماں کو بے کرا سمجھا تھا میں نے

ইলমুদ্দিন এক সাদাসিধে মুসলমান। সে দিনরাত তার পেশায়ই ডুবে থাকতো। জগতের কোনো খোঁজখবরই তার ছিলো না। রাজপালের ঘৃণ্য উদ্যোগে সারা হিন্দুস্তান যে উত্তাল— এর বিন্দুমাত্র খোঁজও ইলমুদ্দিনের ছিলো না। একদিন সন্ধ্যেবেলায় কাজ শেষ করে ইলমুদ্দিন ঘরে ফিরছিলো। দিল্লি দরজার কাছে আসলে সেখানে এক বিশাল সমাবেশ দেখতে পায়। ডায়াস থেকে এক নওজোয়ানের অগ্নিঝরা বক্তৃতার আওয়াজ তার কানে ভেসে আসে। সে কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়ায়। কিন্তু তার মাতৃভাষা পাঞ্জাবি হওয়ায় উর্দু ভাষণ সে খুব বেশি বুঝতে পারে না। উর্দু ছিলো প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা। তার তো আর প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করার সুযোগ হয়নি। পাশের এক ব্যক্তিকে অবস্থা জিজ্ঞেস করলে সে তাকে জানায়, রাজপাল নামের এক হিন্দু প্রকাশক রাসুলুল্লাহ সা. এর শানে গোস্তাখিমূলক বই প্রকাশ করেছে। তার প্রতিবাদে আজকের এ সমাবেশ। কথাটা ইলমুদ্দিনের ভেতরে স্পন্দন জাগায়। রাজপালের দুঃসাহসিকতা তার হৃদয়কে চরমভাবে আহত করে। ইলমুদ্দিন দীর্ঘক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে আলোচনা শুনতে থাকে।  কিছুক্ষণ পর স্টেজে আসেন একজন পাঞ্জাবি বক্তা। ইলমুদ্দিন খুব মনোযোগের সাথে তার আলোচনা শোনে। সেখান থেকেই সে জানতে পারে, রাজপাল তার এই দুঃসাহসিক কাজের কারণে ‘ওয়াজিবুল কতল’ তথা তাকে হত্যা করা অপরিহার্য। ইলমুদ্দিনের মানসজগতে বৈপ্লবিক ঝড় ওঠে। তার চিন্তাভাবনা মনমানসিকতা মুহূর্তেই সব বদলে যায়। কালিমায় এতোদিন একশ্বাসে যে দুই মহান সত্তার নাম নিতো, অশিক্ষিত মানুষটি যে দুই সত্তাকে জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো, সেই রাসুলের শানে এই চরম গোস্তাখিকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।

সমাবেশ শেষ করে মধ্যরাতে ইলমুদ্দিন ঘরে ফিরে। বাবা জিজ্ঞেস করেন, কী ব্যাপার? আজ হঠাৎ দেরি কেনো? ইলমুদ্দিন সব খুলে বলে। রাজপাল ওয়াজিবুল কতল হওয়ার যে কথা সে শুনে এসেছে তাও বলে। তালেমন্দও একেবারে সাদাসিধে কালিমাপাঠকারী মুসলমান ছিলেন।  সব শুনে তিনিও আলোচনার সাথে একাত্মতা পোষণ করেন। তিনিও বলেন, এমন বদমাশকে জাহান্নামেই পৌঁছানো উচিত। কথাটা ইলমুদ্দিনের হৃদয়জগতকে ছুঁয়ে যায়। সে যেনো মৌনভাবে ঘর থেকেও অনুমতি পেয়ে যায়।

সে রাতে ইলমুদ্দিনের আর ঘুম হয় না। পরবর্তী দিন সে তার বন্ধু শেদার সাথে সাক্ষাত করে। শেদাকে সব খুলে বলে। সেই দিনগুলোতে পুরো হিন্দুস্তানজুড়ে মুসলমানদের মূল আলোচনার বিষয় এই একটাই ছিলো। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাট-বাজার— সর্বত্রই চলছিলো রাজপালের দুঃসাহসিকতা ও আস্পর্ধা নিয়ে আলোচনা। ইলমুদ্দিন নিয়মিত শেদার সঙ্গে আলাপ আলোচনা ও পরামর্শ করতে থাকলো। কাজকর্ম নাওয়াখাওয়া কোনো কিছুতেই তার আর মন ছিলো না। সারাদিন একই চিন্তা, একই ভাবনা। প্রথমে পরিবারের চোখে বিষয়টা ধরা না পড়লেও আখের তাদের মনেও সন্দেহ জাগে। তারা তো তখনও জানেন না, কী মহান স্বপ্ন-ভাবনা খেলে যাচ্ছে ইলমুদ্দিনের বুকে। তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, তাদের ছেলে তাদের জন্য জান্নাতের সওদা করছে, তাদেরকে ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব দানের উদ্যোগ নিচ্ছে। তালেমন্দের এক বন্ধু শেদার সঙ্গে ইলমুদ্দিনের মেলামেশার বিষয়টা তাকে অবগত করে। শেদা অনেক ভালো ছেলে ছিলো। কিন্তু তালেমন্দের সেই বন্ধু তাকে জানায়, শেদা একটা আওয়ারা-লম্পট ছেলে।  তার সাথে মেলামেশা করাটা ইলমুদ্দিনের ঠিক হচ্ছে না। তাকে এখনই ফেরানো উচিত। নইলে দিনদিন সে খারাপ হয়ে যাবে। তালেমন্দ ছেলেকে অনেক করে বোঝায়। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয় না।

ইলমুদ্দিন আর শেদা অনেক খুঁজেফিরেও জানতে পারে না যে, কে এই নরাধম রাজপাল আর কোথায়ই বা তার দোকান। সে দেখতেই বা কেমন। পরিশেষে শেদার এক বন্ধুর মাধ্যমে তারা জানতে পারে যে, নরাধম রাজপালের লাইব্রেরি হাসপাতাল রোডে।

এদিকে ইলমুদ্দিনের অনিয়মানুবর্তিতার বিষয়টি তালেমন্দকে অনেক ভাবায়। ছেলে ঠিকমতো কাজে যায় না, নাওয়াখাওয়ারও কোনো খবর নেই। তার কাছে এর একমাত্র কারণ মনে হয় শেদার সঙ্গে মেলামেশা। এদিকে শেদার ব্যাপারে তিনি আরো জানতে পারেন যে, শেদার বাবা একজন জুয়ারি; জুয়ার পয়সা চুখাতে আখের নিজের দোকানটাও যিনি হারিয়েছেন। তালেমন্দ রাগি স্বভাবের মানুষ ছিলেন। একদিন রাতে দেরি করে ঘরে ফিরে ইলমুদ্দিন।  তার অপেক্ষায় ঘরের ভেতর পায়চারি করছিলেন তালেমন্দ। ইলমুদ্দিন ঘরে ফিরলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, কোথায় ছিলে আজ সারাদিন? ইলমুদ্দিন জবাব দেয়, শেদার সাথে। উত্তর শুনে তালেমন্দ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ছেলেকে গালমন্দ করতে থাকেন। ইলমুদ্দিন মাথা নিচু করে সব শুনে যেতে থাকে। তালেমন্দ রাগের প্রচণ্ডতায় শেষ অবধি বলে বসেন, এই মুহূর্তে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যা। যা, ঐ বদমাশের কাছে চলে যা। তোর মুখ আর আমাকে দেখাবি না।

বড় ভাই মুহাম্মাদুদ্দিন ঘরেই ছিলো। সে এসে বাবাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে ঠাণ্ডা করে।  ছোট ভাইকে হাত ধরে তার কামরায় নিয়ে যায়।  এরপর দীর্ঘ সময় নিয়ে খুব করে তাকে বোঝায়। খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে থাকতে বলে।

শেদার ব্যাপারে সকলের নেগেটিভ ধারণা দেখে ইলমুদ্দিনও খুব ব্যথিত হয়। কিন্তু সে মনের কথা কাউকেই খুলে বলতে পারে না। কীভাবেই বা বলবে! যেখানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। সে তো মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে নিয়েছে, যদিও বাহ্যদৃষ্টিতে তা কারোরই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

এভাবেই দিন যাচ্ছিলো। ছেলের অবস্থার পরিবর্তন না দেখে তালেমন্দ সিদ্ধান্ত নেন, বিশ বছর বয়সী ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দেবেন। সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করলে সব ঠিক হয়ে যাবে, অপ্রত্যাশিত অবস্থাও শুধরে যাবে। তারা পাত্রী দেখে ইলমুদ্দিনের বিয়ের কথাবার্তা পাকাপোক্ত করে ফেলেন।

একরাতের কথা, ইলমুদ্দিন স্বপ্নে দেখে, এক বুযুর্গ এসে তাকে বলছেন, “ইলমুদ্দিন, এখনও ঘুমিয়ে আছো?! দুশমন তোমার নবির শানের খেলাফ প্রোপাগান্ডায় লিপ্ত। উঠো। জলদি করো।”

ইলমুদ্দিনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। উত্তেজনায় তার সারা শরীর ঘেমে ভিজে যায়। সে অস্থির হয়ে পড়ে। এরপর ঘুমানোর চেষ্টা করেও আর ঘুমাতে পারে না। অনন্তর উঠে সরাসরি শেদার ঘরে পৌঁছে। শেদাকে নিয়ে ভাটি দরজার কাছে যায়। এরপর তাকে সব খুলে বলে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ইলমুদ্দিন রাতে যে স্বপ্ন দেখেছে, হুবহু একই স্বপ্ন শেদাও দেখেছে। স্বপ্নে দেখা বুযুর্গ উভয়কে একই আদেশ দিয়েছেন। তারা উভয়েই পেরেশান। এবার কে তাহলে এই দায়িত্ব আঞ্জাম দেবে। দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। উভয়ই এই গুরুদায়িত্ব নিজ হাতে সম্পন্ন করতে চাচ্ছিলো। আখের আলোচনার মাধ্যমে কোনো ফায়সালা করতে না পেরে তারা লটারি করে। লটারিতে ইলমুদ্দিনের নাম ওঠে। শেদার অনুরোধে পুনরায় লটারি করা হয়। এবারও ইলমুদ্দিনের নাম ওঠে। শেদার পীড়াপীড়িতে তৃতীয়বার লটারি করলে এবারও ইলমুদ্দিনের নাম ওঠে। ইলমুদ্দিন নিশ্চিন্ত হয়ে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে বাড়িতে ফেরে।

আবারও ইলমুদ্দিন স্বপ্ন দেখে, সেই বুযুর্গ এসে তাকে বলছেন, “উঠো! জলদি করো! দেরি করবে তো অন্য কেউ এসে বাজি নিয়ে যাবে!”

ইলমুদ্দিন শেষবারের মতো শেদার সাথে দেখা করে। স্মৃতির নিদর্শনস্বরূপ তাকে একটি ছাতা এবং একটি ঘড়ি উপহার দেয়। এরপর তার কাছ থেকে শেষ বিদায় নেয়। রাতে তার দু’চোখে ঘুম আসে না। ভাবনায় ভাবনায় কোনোমতে রাতটা কাটিয়ে দেয়।

পরবর্তী দিন ৬ এপ্রিল ১৯২৯ তারিখে ইলমুদ্দিন সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়। গুমটি বাজারের দিকে যায়। আত্মারাম কামারের দোকানে গিয়ে সেখান থেকে নিজের পছন্দমতো একটি ছুরি কিনে। কাঠমিস্ত্রি হওয়ার সুবাদে ছুড়ি-চাকু সে ভালোমতোই চিনতো। ছুরি কেনার পর সে অনেকটা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তৎক্ষণাতই হাসপাতাল রোডে পৌঁছে। আনারকলি হাসপাতাল রোডে ইশরত পাবলিশিং হাউজের সামনেই রাজপালের অফিস ছিলো। সেখানে পৌঁছে ইলমুদ্দিন জানতে পারে, রাজপাল এখনও আসেনি। আর যখন সে আসে, তখন তার হেফাজতে পুলিশও এসে হাজির হয়। ইতোমধ্যে রাজপালের অফিসের সামনে এসে একটি কার থামে। ইলমুদ্দিন জানতে পারে, কার থেকে যে লোকটা নামছে, সে-ই রাজপাল। এই নরাধমই রাসুলের শানে গোস্তাখিমূলক বই প্রকাশ করেছে এবং তা নামমাত্র মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করেছে।

রাজপাল গাড়ি থেকে নেমে সাহেবের মতো দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। অফিসে ঢুকে নিজের চেয়ারে বসে পুলিশকে তার আগমনের কথা জানানোর জন্য টেলিফোন উঠানোর কথা ভাবছে— এমন সময় ইলমুদ্দিন দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। সেসময়ে অফিসে দু’জন কর্মচারী ছিলো। কুদারনাথ পেছনের কামরায় বইপত্র রাখছিলো আর ভগতরাম রাজপালের পাশেই দাঁড়ানো ছিলো। রাজপাল এক তরুণকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে, কিন্তু সে ভাবতেই পারে না যে, মৃত্যু তার এতোই কাছে। ইলমুদ্দিন ভেতরে প্রবেশ করে চোখের পল পড়ার আগেই জামার ভেতর থেকে ছুরি বের করে। তার হাতটা উঁচুতে উঠে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই ধারালো ছুরির আঘাত রাজপালের বুকে গিয়ে বিদ্ধ হয়। ছুরির ফলা রাজপালের কলজে ভেদ করে। এক আঘাতেই আহ শব্দ উচ্চারণ করে রাজপালের দেহ মুখ থুবড়ে যমিনে পড়ে। ইলমুদ্দিন দ্রুত পেছনে ফিরে দোকান থেকে পলায়ন করে। দোকানের দুই কর্মচারী বাইরে এসে চিৎকার করতে থাকে, “ধরো! ধরো! … মেরে ফেলেছে! মেরে ফেলেছে!” কাশ্মীর থেকে রাসকুমারি পর্যন্ত চারিদিকে দাবানলের মতো গাজি ইলমুদ্দিনের বাহাদুরির কথা ছড়িয়ে যায়। সর্বত্র এই ইমানদীপ্ত তরুণের কালজয়ী কারনামার কথা আলোচনা হতে থাকে। গাজি ইলমুদ্দিন নবিপ্রেমের নযরানা পেশ করার অপরাধে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়।

১০ এপ্রিল ১৯২৯ তারিখে গাজি ইলমুদ্দিনকে সর্বপ্রথম আদালতে ওঠানো হয়। ইমানের চেতনার দাবিতে অবশেষে গাজি ইলমুদ্দিনের পক্ষে একঝাঁক মুসলিম ওকিল সাড়া দেন। ব্যারিস্টার খাজা ফিরোজ উদ্দিন, ব্যারিস্টার ফারাখ হুসাইন এবং তাদের সহযোগিতায় ডা. এ আর খালেদ, মাস্টার সেলিম এবং আরো কয়েকজন আল্লাহর বান্দা এই মামলার পক্ষে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওকিলরা গাজি ইলমুদ্দিনের পক্ষে অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। অসংখ্য দলিল ও আইনের ধারা পেশ করেন। কিন্তু ফায়সালা তো পূর্বনির্ধারিত। ৯ মে ১৯২৯ তারিখে গাজি ইলমুদ্দিনের ব্যাপারে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়।

ব্যারিস্টার ফারাখ হুসাইন মোম্বাই গিয়ে ওকিল (পরবর্তীতে কায়িদে আজম) মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর সাথে সাক্ষাত করেন। গাজি ইলমুদ্দিনের পক্ষে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন। মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ তার প্রস্তাবে সম্মত হন। লাহোর হাইকোর্টে আপিল করেন। যথাসময়ে শুনানি হয়। মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ আদালতে বলেন, “ইওর অনার! ইসলামের নবি রাসুলুল্লাহ সা. এর শানে গোস্তাখি করা এবং জনসাধারণের মধ্যে দ্রোহের আগুন উসকে দেয়া ১৩৫ ধারার আলোকে দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এতোদসত্ত্বেও প্রকাশক রাজপালের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আইনের নিস্তব্ধতাই গাজি ইলমুদ্দিনকে আইন নিজ হাতে তুলে নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। এজন্য গাজি ইলমুদ্দিনের অপরাধকে ৩০২ ধারায় মার্ডার গণ্য না করে ৩০৮ ধারায় এজিটেশন কিলিং গণ্য করা উচিত, যার শাস্তি বেশি থেকে বেশি সাত বছর কারাদণ্ড হতে পারে। তাছাড়া গাজি ইলমুদ্দিনের যে বয়স, তাতে সে মৃত্যুদণ্ডের আইনের আওতাভুক্তও নয়।”

লাহোর হাইকোর্টের কট্টর হিন্দু জাস্টিস শাদিলাল কোনো কথায় কর্ণপাত না করে আপিল খারিজ করে দেয়। এরপর ফাঁসির জন্য গাজি ইলমুদ্দিনকে মিয়ানওয়ালি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ৩১ অক্টোবর ১৯২৯ তারিখে গাজি ইলমুদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মাত্র একুশ বছর বয়সী অতি সাধারণ মুসলিম কাঠমিস্ত্রি গাজি ইলমুদ্দিন রাসুলের মহব্বতে শাহাদতের অমীয় সুধা পান করে সবুজ পাখির ভেতর প্রবিষ্ট হয়ে জান্নাতে বিচরণ করার সৌভাগ্য লাভ করে।

ইলমুদ্দিনের জানাজা

ফাঁসি কার্যকর করার পর সেখানেই জানাযা ছাড়া গাজি ইলমুদ্দিনকে দাফন করা হয়।  এদিকে তার শাহাদাতের খবর দাবানলের মতো সারা হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। শহিদের লাশ তার ওসিয়ত মোতাবেক লাহোরে দাফন করার দাবিতে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়। মুসলমানরা আল্লামা ইকবালের নেতৃত্বে বরকত আলী মোহামেডান হলে সমাবেশ ঘোষণা করে। ১ নভেম্বর আল্লামা ইকবালের বাসভবনে জলসা সংঘটিত হয়। ২ নভেম্বর আল্লামা ইকবালের দাবিতে প্রোফেশনাল মুসলিম লীগের কাউন্সিলে ফিরিঙ্গি সরকারের থেকে শহিদের লাশ আদায়ের ব্যাপারে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হয়। ৫ নভেম্বর আল্লামা ইকবাল, স্যার মুহাম্মাদ শফি, মিয়াঁ আব্দুল আজিজ, মাওলানা গোলাম মুহিউদ্দিন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ গভর্নরের সাথে সাক্ষাত করে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে শহিদের লাশ সমর্পণের জন্য আবেদন করেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে ইংরেজ সরকার শাহাদাতের ১৪ দিন পর মুসলমানদের কাছে শহিদের লাশ অর্পণ করে। শহিদের লাশ কবর থেকে উঠিয়ে ট্রেনে লাহোরে নিয়ে যাওয়া হয়। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুসারে গাজি ইলমুদ্দিনের জানাযায় ছয় লক্ষ মুসলমান অংশগ্রহণ করে। লাহোরের ভাটিচক থেকে শুরু করে সুমনাবাদ পর্যন্ত পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জানাযা শেষে আল্লামা ইকবাল এবং সায়্যিদ দিদার আলী শাহ নিজ হাতে শহিদের লাশ কবরে রাখেন। যখন তার লাশ কবরে রাখা হচ্ছিলো, তখন মাওলানা যফর আলী খান চিৎকার করে বলে ওঠেন, “হায়! আজ এই মর্যাদা যদি আমার নসিবে জোটতো!” ঠিক সেই মুহূর্তেই আল্লামা ইকবালের যবান থেকে উচ্চারিত হয়—

اسی گلاں ای کر دے رہ گئے تے تر خاناں دامنڈابازی لے گیا

আমরা পরিকল্পনাই বানাতে থাকি আর এক কাঠমিস্ত্রির ছেলে এসে মর্যাদা লুফে নিয়ে যায়।

১৪ নভেম্বর ১৯২৯ তারিখে গাজি ইলমুদ্দিন শহিদ রহ. এর পবিত্র লাশকে তার ওসিয়ত মোতাবেক লাহোরের ভাওয়ালপুর রোডের নিকটস্থ মিয়ানি সাহেব কবরস্থানে দাফন করা হয়। মহান আল্লাহ এই নবিপ্রেমিক খুদে শহিদের সমাধির ওপর অজস্র রহমত বর্ষণ করুন। আমিন।

সুত্র: উইকিপিডিয়া, alihasanosama.com, urduhistory

0 মন্তব্য
3

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!