উপমহাদেশে ছাপাখানা আসার আগেও মুঘলরা সাংবাদিকতায় উন্নত ছিলো

by sultan

ষোড়শ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে তদানীন্তন ভারতবর্ষের সাংবাদিক বলতে লিখিত সংবাদকেই বুঝাতো। পূর্বের দিনের রাজা বাদশারা তাদের শাসনকালে ঘটনা ও কর্য্যক্রম লিপিবদ্ধ করার জন্যে সংবাদ লেখকদের চাকরিতে নিয়োগ করতেন। মুঘল শাসকগণও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে সংঘটিত ঘটনাবলী সম্পর্কে জানার প্রয়াসে তারা নিজ নিজ রাজ্যে সংবাদ লেখক বা ‘ওয়াকিয়ানভীস’ নিয়োগ করতেন। এ নীতি তাদের ক্ষেত্রে প্রায় সার্বজনীন হয়ে উঠে এবং আকবরের সময় এর সার্বিক প্রয়োগ পরিদৃষ্ট হতে দেখা যায়। ‘ওয়াকী’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘ঘটনা’ বা ‘সংবাদ’ যেই থেকে ‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ আক্ষরিক অর্থে যিনি ঘটনার খোঁজ খবর রাখেন হিসাব রাখেন। রাজ্য বিস্তারের সংগে সংগে সম্রাট আকবরের সময়ে সংবাদ লিখন ও প্রকাশের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তার সময়ে ‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করতো এবং দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে তাদের ভূমিকা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াকীয়ানভীসদের কর্মকান্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে আবুল ফজল আরো বলেন, ‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ বাদশাহের সমস্ত হুকুম লিখে নেন। বাদশাহের রোজ নামচা লিখে থাকেন। বাদশাহের কাছে রোজ যেসব আবেদন অভিযোগ উপস্থিত হয় তার হিসাব রাখেন। এছাড়া বাদশাহের পানাহার ব্যবস্থা, শিকারের উদ্যোগ ইত্যাদি করেন এবং নজর, ফরমান। হুকুম ইত্যাদির হিসাব রাখেন। রাষ্ট্রের ভিতরের ও বাইরের বিবরণ পাঠ করা। কোন দেশে কার সঙ্গে কিভাবে সন্ধি হলো তার স্মারকলিপি লিখে রাখা। রাজ্যের মাঝে কোথায় কি ঘটলো তার বিবরণ রাখা এসব হল ওয়াবিয়ানভীসদের কাজ।

‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ প্রতিদিন একটি রোজনামচা লিখে নিয়ে এসে বাদশাহকে পড়ে শোনান এবং বাদশাহ তা মঞ্জুর করলে তাতে মোহর দিয়ে দস্তখত করেন। এই দস্তখতী কাগজকে ‘ইয়াদন্ড’’ বা স্বারকলিপি বলে। আওরঙ্গজেবের সময়ে ওয়াকিয়ানভীসদের বিভিন্ন প্রদেশে পাঠানো হতো। তদের কাজ ছিল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে খবর সংগ্রহ করে সম্রাটের নিকট প্রেরণ করা। তাদের বলা হতো ‘বার্তাবাহক’। অনেক সময় এই সকল ওয়াকিয়ানভীসদের পাঠানো খবরগুলো অসত্য ও মিথ্যা রিপোর্টে পূর্ণ থাকতো। কারণ রাজ্য পালের সাথে ওয়াকিয়ানভীসদের বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় তারা অনেক মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করতো। আবুল ফজলের ‘আইন-৯-আকবরীতে’ ওয়াকিয়ানভীসদের অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রিপোর্টের কথা বলা হয়েছে। মুঘল রাজত্বের প্রথম থেকেই ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পর্যটক ভ্রমণ করেন। তাঁদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে মুঘল আমলের সাংবাদিকতা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারা যায়। ফ্রাসোঁয়া বেনিয়ার একজন ফরাসী পর্যটক যিনি ১৬৬৫ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৬৬৮ খ্রীঃ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্য ভ্রমণ করেন। তিনি প্রথম জীবনে সম্রাট শাহজাহানের দরবারে একজন চিকিৎসক হিসেবে যোগান করেন এবং আওরাঙ্গজেবের রাজত্বকালে উক্ত পদেই বহাল ছিলেন। মুঘল আমলের সাংবাদিকতার ওপর সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘মুঘল বাদশাহ প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ পাঠান। তাদের একমাত্র কাজ হলো যেখানে যা ঘটবে তা ঠিকভাবে বাদশাহকে জানানো। কিন্তু বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসনকর্তার সঙ্গে প্রায়ই এই সব ‘‘ওয়াকিয়ানভীসদের মতাত্তর ও মনোমালিন্য হয়। ফলে তাদের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়। সুতরাং প্রজাদের কোন দিক থেকেই নিশ্চিত হবার সুযোগ ছিল না এবং দুঃখ দুর্দশা অভিযোগ ইত্যাদি সম্রাটেরও কর্ণগোচর হতো না’’ ভেনিযায় পর্যটক নিকোলা মেনিস যিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে বেশ কিছুকাল ছিলেন। তিনি তার ‘‘স্টেটির ডু মান’’ গ্রন্থে দুই ধরনের সংবাদদাতার কথা বলেছেন।

‘ওয়াকিয়ানভীস’ যাদের তিনি পাবলিক রিপোর্টার বলে আখ্যায়িত করেছেন।
‘খুকিয়ানভীস’ যাদের তিনি গুপ্তচর বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি আরও বলেন যে, ‘‘ওয়ারিয়ানভীস’’ ও খুকিয়ানভীসদের পাঠানো খবরাদি নিয়ে সপ্তাহে একটি হাতে লেখা গেজেট বের হতো। এতে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীসমূহ স্থান পেত। সম্রাট হেরেমে মহিলাদের উপস্থিতিতেই সেই সকল রিপোর্ট শুনতেন এবং এটা মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো। যার দরুন সমাজে কখন কোথায় কি ঘটতে যাচ্ছে রাজপুত্ররা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে কি না তা এই রিপোর্ট সুনার মাধ্যমে সম্রাট জানতে পারতেন।’’

আধুনিককালে ঐতিহাসিকদের মধ্যে স্যার যদুনাথ সরকার তার ‘‘মোঘল এ্যাডমিনিস্টেটর’’ গ্রন্থের নিউজ রাইটার অধ্যায় মুঘল আমলের সাংবাদিকতার উপর চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। সমসাময়িককালের কোন ঐতিহাসিক তার মত করে মুঘল আমলের সাংবাদিকতার উপর এত সুন্দর বর্ণনা দিতে পারেননি। স্যার যদুনাথের মতে, মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় সরকার চার প্রকার সংবাদদাতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের খবরাখবর পেত। যেমন-

ওয়াকিয়ানভীস
সাওনিওনভীস বা সাওয়ানিহ নিগার
খুকিয়ানভীস উপরোক্ত সংবাদদাতাদের সকলকেই লিখিত বিবরণী কেন্দ্রে প্রেরণ করতে হতো।
হরকরাহ আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে- সংবাদ বহনকারী কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একজন গুপ্তচর যে মৌখিক সংবাদ সংগ্রহ করতো এবং কেন্দ্রে সংবাদবাহী পত্র পাঠাতো।
‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’কে কখনও কখনও ‘‘ওয়াকিয়ানিগার’’ ও বলা হত। ‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ ও সাওয়ানিহ নিগার’’ একই ধরনের অর্থাৎ লেখক বা ঘটনাবলীর পরিদর্শনকারী বুঝায়। তবে তাদের দু’জনের মাঝে পার্থক্য এই যে, ‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ ছিলেন একজন অধিক নিয়মিত গণসংবাদদাতা কিন্তু ‘‘সাওয়ানিহ নিগার’’ গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করতো এবং ওয়াকিয়ানভীসদের কাজের ওপর দৃষ্টি রাখতো। ‘‘মিরাট-ইআহমদী’’তে বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে মূলত এদেশের ঘটনাবলীর বিরবণ পেশ করার জন্য ‘‘ওয়াকিয়ানভীসদেরকে নিযুক্ত করা হতো। কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তাদের ধারা সত্য ঘটনা চেপে রাখার সম্ভাবনা থাকার জন্যে ‘‘যাওয়ানিহ নিগার’’দেরকে (যাদের খুলিয়ানভীস বলা হয়)। গোপনে প্রকৃত সংবাদ সংগ্রহ করার উদ্দেশ্য যুবার বিভিন্ন অঞ্চলে গোয়েন্দারূপে নিয়োগ করা হতো। বস্তুতপক্ষে তারা ছিল অত্যন্ত গোপনীয় সংবাদদাতাদের শ্রেণীভুক্ত। মিরাট-ই-আহমদীতে বলা হয়েছে যে যখন একজন নতুন ওয়াকিয়ানভীস নিয়োগ করা হতো তখন তাকে সত্য বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রেরণ করতে এবং কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা প্রলোভনে পড়ে সংবাদ বিকৃত করতে নিষেধ করা হতো। জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক ইতিহাস ‘‘বাহরিস্তান-ই-গায়েবী’’ অনুযায়ী এবং বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা প্রবর্তন ও রাজদরবারে সংবাদদাতাদের প্রেরিত সংবাদ বিবরণী প্রকাশ্যে পঠনের উদ্দেশ্য ছিল পারস্য দেশীয় রাজদূতের সম্মুখে মোগলদের শৌর্যবীর্য প্রদর্শন করা। ছোট ছোট পরগণার ঘটনাবলীর বিবরণ প্রেরণ করার জন্যে ‘‘ওয়াকিয়ানভীস’’ তার অধীনে বিভিন্ন পরগণার প্রতিনিধি নিয়োগ করতো। প্রাদেশিক শাসনকর্তার প্রকাশ্য দরবার অনুষ্ঠিত হলে ওয়াকিয়ানভীস দরবারে উপস্থিত থেকে দরবারের কার্যাবলীর ধারা বিবরণী তৎক্ষণাৎ লিপিবদ্ধ করতো। ‘‘আওয়ালিহ নিগার’’ এইরূপ কাজ করতো না’’ যদুনাথ সরকারের ‘‘ম্যানিউয়্যাল অব অকিসারস ডিউটিজ’’-এ উল্লেখ আছে ‘‘যে ওয়াকিয়ানভীস প্রতি সপ্তাহে একবার ঘটনাবলীর প্রতিবেদন প্রেরণ করতো।’’ কোনো কোনো প্রদেশে একই ব্যক্তিকে বদলী ও ওয়াকিয়ানভীস’’ পদে নিযুক্ত করা হতো। এটাও প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থায় পরিলক্ষিত হয়। ‘‘খুকিয়ানভীস’’ ছিল একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত গোপনীয় সংবাদদাতা। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অজ্ঞাতে, অগোচরে তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ রক্ষা না করেই ‘‘খুকিয়ানভীস’’ ঘটনাবলী স্পটে গোপন সংবাদ কেন্দ্রে প্রেরণ করতো। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তার নামও জানতেন না। স্থানীয় জনসাধারণ তাই গোপন সংবাদ প্রেরকদেরকে ভীষণ ভয় করতো। ওয়াকিয়ানভীস প্রাদেশিক সরকারের সদর দফতরে প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে তার অধীনস্থ সংবাদদাতাদের মাধ্যমে ঘটনাবলীর বিবরণ পেতো এবং শহরের বিবরণীসহ উহা সম্রাটের দরবারে প্রেরণ করতো। দারোগা-ই-ডাক অর্থাৎ ডাক বিভাগের প্রধানের মাধ্যমে বিস্তারিত বিবরণী কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট পাঠানো হতো। ডাক বিভাগের প্রধানকে প্রদেশের গুপ্ত সংবাদ প্রেরণ সংস্থার প্রধান কর্মকর্তা অর্থাৎ গোয়েন্দা প্রধানরূপে কাজ করতে হতো। তার অধীনস্থ কর্মচারী ছিল প্রধানত গুপ্তচর বেশে সংবাদদাতা যথা আওয়ানিহ নিগার বা খুকিয়ানভীস। স্থানীয় অবস্থা ও ঘটনাবলী সম্পর্কে প্রতিবেদন বাদশাহের নিকট প্রেরণের জন্য হরকরাহ পদ্ধতি প্রবর্তিত ছিল। তাই উল্লেখিত মোগলদের গোপনে সংবাদ প্রেরণ পদ্ধতিতে ‘আখবারনবীশ’ শব্দটি পরিচিত। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সাম্রাজ্য শাসনে গুপ্তচর বিভাগের প্রকৃত প্রভাব স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। গুপ্তচরদের প্রভাবের উদাহরণ হামিদ উদ্দিনের আহকাম-ই-আলমগীরিতে পাওয়া যায়। মোগল সম্রাটদের সাথে একমাত্র আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সংবাদপত্র রাজকীয় গন্ডি অতিক্রম করে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কেবল সম্রাট বা রাজন্যবর্গ সংবাদপত্রের বিষয় হবে এটা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তাই সে সময়ে সরকারি বা বেসরকারি উভয় মহলের প্রচেষ্টায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে। ফলে সংবাদিকতার ক্ষেত্রে আরও পরিব্যাপ্তি লাভ করে। এর ফরে সাধারণ মানুষ সরকারের কার্যকলাপের সমালোচনা করার সুযোগ পায়। সংবাদপত্র সৈনিকদের মাঝেও যথারীতি সরবরাহ করা হতো যাতে তারা রাষ্ট্রীয় শাসন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে এবং নিজেদের মাঝে ঐক্য বজায় রাখতে পারে। ‘‘বাকি খান রচিত ‘‘মুনতাখাবাত আললুবাব’-এ সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে সে সময়ে হাতে লেখা পত্রিকায় শিবাজী বংশের রাজ্যধামের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলে মোগল শিবিরের লোকজন তা প্রথম জানতে পারে। এই পত্রিকাটি সবচেয়ে প্রাচীন হাতে লেখা সংবাদপত্র। ঐতিহাসিক কাফি খান রচিত ‘‘ইতিহাস’’ গ্রন্থটিতে সর্বপ্রথম তখনকার যুগের খবরের কাগজ সম্পর্কে ঐ সংবাদপত্রটির উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে কোনো ইতিহাস গ্রন্থে খবরের কাগজের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। কর্নেল জেমস ট্রেড ১৮২৬ খৃঃ মোগল আমলের আওরঙ্গজেবের সময়কালে অর্থাৎ ১৬৬০ খৃঃ হাতে লেখা সংবাদপত্রের কিছু কপি উদ্ধার করেন এবং সেগুলোতে সংবাদপত্রের কিছু কপি উদ্ধার করেন এবং সেগুলোর লন্ডনের রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রেরণ করেন। ঐ সকল সংবাদপত্র সম্পর্কে জার্নাল অব এশিয়া সোসাইটিতে একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। তার বর্ণনানুযায়ী ঐ সকল পত্রিকার ভাষা ছিল কথ্য এবং পত্রিকাগুলো বিভিন্নজনের হাতের লেখায় ছিল সমৃদ্ধ। পত্রিকাগুলোতে যেসব বিষয় প্রাধান্য পেত সেগুলো হচ্ছে রাজদরবারের কর্মচারীদের পদোন্নতির বিবরণ, বাদশাহের মসজিদ, মন্দির, মৃগয়া, ভ্রমণ এবং নওরোজ অনুষ্ঠান। মোগল আমলের প্রাপ্ত সংবাদপত্রগুলো সম্পর্কে গবেষকদের সর্বসম্মত রায় হচ্ছে এগুলো জানমালের পরিচর্যার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম ছিল। মোগল আমলের হাতে লেখা সংবাদপত্র পুনঃ নিরীক্ষা করে দেখার পরিপ্রেক্ষিতে লর্ড এয়ুক ল্যান্ড বলেন যে, ‘‘আগের দিনে যখন বিশেষ করে রাজা এবং রাজপুত্রেরা সংবাদ লেখক নিয়োগ করতো তখন পান্ডুলিপিগুলোতে তাদের প্রভাব ছিল বেশি এবং নিজেদের স্বার্থে তারা অনেক সময় নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন করতো না। এমনকি রাজপরিবারের হাস্যকৌতুকও অনেক ক্ষেত্রে সংবাদপত্রে স্থান পেত। বিশেষ করে বার্মা যুদ্ধের সময় অনেক মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনমনে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। অবশ্য একথা স্বীকার্য যে যদি পান্ডুলিপির আকারে এই সংবাদগুলো প্রকাশিত না হয়ে যদি সংবাদপত্রের মাধ্যমে পরিবেশিত ও প্রকাশিত হতো তাহলে এত ভুল খবরের ছড়াছড়ি হতো না। তাই সাংবাদিকতার প্রয়োজন প্রাচীনকালেই অনুভূত হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে ভারতবর্ষের সাংবাদিকতার বিকাশ কি মোগল আমলেই শুরু হয়েছিল? ভারতবর্ষের সাংবাদিকতায় কি মোগলদের অবদানই প্রণিধানযোগ্য? ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সুলতান সালাউদ্দিন খিলজি তার বিশাল সাম্রাজ্যকে নিরঙ্কুশভাবে শাসন করার জন্যে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশের খবরাখবর জানার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং গড়ে তোলেন ডাক চৌকি ব্যবস্থা। পরবর্তীকালে মুহাম্মদ তুঘলকের সময়ে এই ডাক ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে এবং ডাক চৌকি ব্যবস্থাকে দু’ ভাগে বিভক্ত করা হলো : (১) অশ্বারোহী বাহিনী ও (২) পদাতিক বাহিনী।

পদাতিক বাহিনীকে বলা হতো রানার। এই সকল রানারেরা পর্যায়ক্রমে এক ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটিতে ছুটে চলতো খবরের বোঝা নিয়ে। যার ফলে সিন্ধু থেকে দিল্লী পৌঁছাতে যেখানে সাধারণভাবে পঞ্চাশ দিন সময় লাগতো। সেই পথ সংবাদ বাহকেরা মাত্র পাঁচ দিনে অতিক্রম করতো। পরবর্তীকালে অর্থাৎ শের শাহের আমলে এই ডাক চৌকি ব্যবস্থার আরও ব্যাপক উন্নতি ও বিস্তৃতি ঘটে এবং তারই সময়ে সর্ব প্রথম অশ্বারোহী বাহিনীকে ডাক বহনের কাজে লাগানো হয়। তার শাসন ব্যবস্থানুযায়ী সোনারগাঁ থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তার ধারে ধারে দু’ মাইল অন্তর একটি করে বিশ্রামাগার নির্মাণ হয়েছিল। সেগুলোই আবার ডাক চৌকির কাজে লাগানো হতো। এভাবেই বহু পূর্ব হতেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন সম্রাট নিজেদের অজান্তেই সাংবাদিকতায় যে বীজ বপণ করে গিয়েছিলেন তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মোগল যুগে।

কৌতূহলের বিষয় এই যে, উপমহাদেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগের পূর্বে ছাপাখানার অস্তিত্ব না থাকলেও মোগল আমলে সাংবাদিকতার অস্তিত্ব ছিল। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে উপমহাদেশে সাংবাদিকতার বিকাশ বহু পূর্ব হতেই শুরু হলেও ছাপাখানার (প্রকাশনা) ক্ষেত্রে এত বিলম্ব হলো কেন? এর কারণ ভারতবর্ষের মধ্যযুগের সম্রাটগণ (বিশেষ করে মোগল সম্রাটগণ) সুন্দর হস্তাক্ষরের লোকদেরকে পুস্তক ও সরকারি আদেশ কপির নকল করার জন্যে লিপিকাররূপে নিয়োগ করতেন। যার দরুন তখন তারা ছাপাখানার প্রয়োজন অনুভব করেননি এবং সে চিন্তাও তাদের মাথায় ঠাঁই পায়নি। ফলে এই উপমহাদেশের প্রকাশনার ক্ষেত্রে এত বিলম্ব পরিলক্ষিত হয়।

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!