কসোভার যুদ্ধ: উসমানীয়দের কষ্টার্জিত বিজয় ও সুলতান মুরাদের দোয়া

by sultan

১৩৫৯ খৃস্টাব্দে অরখানের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য দ্বিতীয় পুত্র প্রথম মুরাদ ৪০ বছর বয়সে তুরস্কের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি শাসক ও বিজেতা হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি একটি ক্ষুদ্র রাজ্যকে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। তার রাজত্বকালে তুরস্কের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজিত হয়েছিল। তার এ কৃতিত্বের মূলে মন্ত্রী কারা খলিলের বিশেষ অবদান ছিল। সিংহাসনে আরোহণ করার পর মুরাদ উসমানীয়-সাম্রাজ্য সম্প্রসারণে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু এশিয়া মাইনরে বিদ্রোহ দেখা দেয়ায় তার আশা সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি অনতিবিলম্বে বিদ্রোহের মোকাবিলা করে তা দমন করেন। এ সময় গ্রীক সাম্রাজ্য বারবার যুদ্ধের ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ সুযোগ গ্রহণ করে মুরাদ থ্রেস জয় করবার ইচ্ছা পোষণ করলেন এবং এ উদ্দেশ্যে দার্দানেলিস অতিক্রম করে থ্রেস অভিমুখে যাত্রা করলেন।

১৩৬৮ খৃস্টাব্দে এস্কিবাবাতে গ্রীকগণ তাকে প্রবলভাবে বাধা প্রদান করে। তবে মুরাদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী প্রচন্ড যুদ্ধে গ্রীকদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করতে সমর্থ হয়। ফলে আদ্রিয়ানোপল তুর্কীদের অধিকারে চলে আসে। এরপর একে একে ফিলিপলিস, থ্রেস ও মেসিডোনিয়ার কিয়দংশ তুর্কীদের হস্তগত হয়। গ্রীক সম্রাট মিত্ররাজ্য হিসেবে তুরস্কের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন। সুলতান মুরাদ ১৩৬৬ খৃস্টাব্দে ব্রুসা থেকে তার রাজধানী আদ্রিয়ানোপলে স্থানান্তরিত করেন। আদ্রিয়ানোপল ও অন্যান্য গ্রীক শহরের পতনের ফলে সমগ্র খৃস্টান জগতে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। পঞ্চম পোপআরবন তুর্কী মুসলমানদের অগ্রগতি প্রতিহত করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে এক ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করে। তুর্কীদের ইউরোপীয় ভুখন্ড থেকে বিতাড়িত করার জন্য পোল্যান্ড, হাঙ্গেরী, সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া এই ধর্মযুদ্ধে অংশ নেয়। পঞ্চম পোপ আরবন ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের সহায়তায় বিশাল খৃস্টান বাহিনী গঠন করলেন। অতঃপর খৃস্টানদের বিশাল সম্মিলিত বাহিনী তুর্কীদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলো। মুরাদও ভীতু হলেন না। তিনি খৃস্টানদের মোকাবিলা করার জন্য সুশিক্ষিত মুসলিম বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। ১৩৬৪ খৃস্টাব্দে মারিৎজা নদীর সন্নিকটে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলো। তীব্র ও প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুরাদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী খৃস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। এর ফলে সমগ্র মেসিডোনিয়া তুর্কীদের পদানত হলো। অতঃপর মুরাদ বল্কান পর্বত অতিক্রম করে সার্বিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে সার্বিয়াবাসী তার কাছে আত্মসমর্পণ করে বার্ষিক করদানে সম্মত হয়। মুরাদের সাথে বুলগেরিয়ার কার্ল তার কন্যার বিবাহ দিয়ে বন্ধুত্ব স্থাপন করলেন। কিছুদিন পর সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া সুলতান মুরাদের সাথে সন্ধিভঙ্গ করে শত্রুতা শুরু করলে মুরাদ তাদের বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। সামাকফে উভয়পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ হলো। যুদ্ধে তুর্কীদের কাছে খৃস্টান নগরী পুনরায় নির্মমভাবে পরাজিত ও বিধ্বস্ত হলো এবং সেইসাথে বুলগেরিয়া অটোমান তথা তুরস্ক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলো। মুরাদ বলকানের দিকে আরো অগ্রসর হয়ে সার্বিয়ার কাছ থেকে সোফিয়া ও নীগ অধিকার করেন।

এভাবে তিনি বলকান অঞ্চলে তুরস্কের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। মুরাদ ইউরোপের ন্যায় এশিয়া মাইনরেও রাজ্যবিস্তার করেন। তবে এশিয়া মাইনরে রাজ্যবিস্তারের ক্ষেত্রে তিনি বৈবাহিক সম্পর্ক ও অন্যান্য কূট-কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বায়োজীদের সাথে কারামিয়ান আমীরের কন্যার বিবাহ দেন। কারামিয়ান ছিল এশিয়া মাইনরের একটি তুর্কী রাজ্য। ছেলের বিয়ের উপহার হিসেবে তিনি কুতাইয়া দুর্গ লাভ করেন। ১৩৭৭ খৃস্টাব্দে তিনি হামিদের আমীরকে তাঁর রাজ্যের কিয়দংশ তাঁর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করেন। ১৩৭৮ খৃস্টাব্দে তিনি টেক্কীর আমীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তার রাজ্যের কিয়দংশ দখল করতে সমর্থ হন। কারামিয়ানের বিরুদ্ধে অভিযানের পর মুরাদ পুনরায় ইউরোপীয় শক্তির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। এ সময় সার্বিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সার্বিয়ার রাজা লাজারাসের সাথে তুরস্কের সুলতান মুরাদের সংঘর্ষের পেছনে কয়েকটি কারণ নিহিত ছিল। প্রথমতঃ অর্থসম্পদে এক সময় বাইজানটাইন সাম্রাজ্য সমৃদ্ধ ছিল। এ জন্য অটোমান তুর্কীরা এই সাম্রাজ্য জয় করতে প্রলুব্ধ হয়। দ্বিতীয়ত বাইজানটাইনীয় সম্রাট ছিলেন খৃস্টান আর অটোমান তথা তুর্কী সুলতান ছিলেন মুসলমান। অধিকন্তু খৃস্টান যুবকদের নিয়ে তুর্কীদের জেনিসারী বাহিনী গঠিত হলে খৃস্টান যুবরাজরা এতে হিংসায় জ্বলে মরছিল। ফলে খৃস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সর্বদা বিরোধ লেগেছিল। তাছাড়া মুসলমানদের কাছে ইউরোপীয়গণ তাদের পরাজয়ের কথা ভুলতে পারেনি। তাই তারা ইউরোপীয় ভুখন্ড থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করার জন্য সার্বিয়ার রাজা লাজারাসের নেতৃত্বে পুনরায় একত্রিত হলো। লাজারাসের নেতৃত্বে বিশাল সম্মিলিত খৃস্টান বাহিনী তরস্কের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলো। সুরতান মুরাদও সম্মিলিত খৃস্টান বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য তার সুশিক্ষিত মুসলিম বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। ১৩৮৯ খৃস্টাব্দে কসোভার ঐতিহাসিক প্রান্তরে উভয়পক্ষ পরস্পরের মুখোমুখি হলো। প্রচন্ড যুদ্ধে মুরাদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী লাজারাসের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত খৃস্টান বাহিনীকে পরাজিত ও বিধ্বস্ত করতে সক্ষম হয়। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লাজারাসকে বন্দি করা হয় এবং সুলতান মুরাদের সাথে চুক্তিভঙ্গের দায়ে তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে প্রাণদন্ড দেয়া হয়।

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলো। মুরাদের সামনে দিয়েই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো যুদ্ধবন্দীদের। এদের মাঝে ছিলো সার্বিয়ান এক অভিজাত বংশীয় লোক, নাম তার মিলোস ওবিলিচ। হঠাৎ করেই হাতের বাঁধন ছুটিয়ে সাথে থাকা গোপন ছোরাটি বের করে সুলতানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওবিলিচ। উপর্যুপরি আঘাত করে সেখানেই সুলতানকে শহীদ করে সে। এরপর অবশ্য ওবিলিচকেও হত্যা করেন সুলতানের দেহরক্ষীরা। কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা তো ঠিকই হয়ে গেছে, শহীদ হয়েছেন ওসমানী সাম্রাজ্যের তৃতীয় সুলতান প্রথম মুরাদ।

কসোভার যুদ্ধ তুরস্কের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কসোভার যুদ্ধক্ষেত্র বলকানে ওয়াটারলু বলা হয়। এ যুদ্ধ পাঁচশত বছরের জন্য তুর্কীদের সাথে স্লাভজাতির ভাগ্য নির্ণীত হয়। কসোভার যুদ্ধে তুরস্ক সাম্রাজ্যের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর ফলে তুর্কীগণ ইউরোপে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণে নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা লাভ করে। কিন্তু, কসোভা বিজয়ের পরিসমাপ্তি মুরাদের জন্য সুখের হয়নি। যুদ্ধশেষে কাভিলভিচ নামে একজন সার্বিয়ান সৈন্যের অতর্কিত হামলায় তিনি নিহত হন (১৩৮৯ খৃ.)। তুরস্কের ইতিহাসে মুরাদ একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে ক্ষুদ্র তুর্কী রাজ্য একটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করে একে একটি অজেয় শক্তিতে পরিণত করেন। থ্রেস, মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া, আদ্রিয়ানোপল, সার্বিয়া প্রভৃতি ইউরোপীয় রাজ্য তিনি তার সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। তুর্কী সুলতানদের মধ্যে তিনিই প্রথম ইউরোপের রাজ্যবিস্তার করেন। ইউরোপে তিনি এমন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন যে, ইউরোপীয় শক্তিবর্গ তার বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। মুরাদ একজন অসামান্য যোদ্ধা, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, প্রজারঞ্জক ও বিদ্যোৎসাহী নরপতি ছিলেন। তিনি একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন এবং আল্লাহর প্রতি ছিল তার অগাধ বিশ্বাস। তার দূরদর্শীতার ফলে তুরস্ক ইউরোপীয় শক্তিতে পরিণত হয়। বীরোচিত কার্যাবলীল জন্য অনেক ঐতিহাসিক তাকে ‘মধ্যযুগীয় আলেকজান্ডার’ বলে অভিহিত করেছেন। শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় তিনি যে অবদান রেখে গেছেন তাতে তার নাম তুরস্ক তথা বিশ্ব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কসোভার যুদ্ধের আগে সুলতান মুরাদের দোয়া:
হে আল্লাহ! হে পরম দয়ালু! হে আসমান জমিনের রব! হে ফরিয়াদির ফরিয়াদ স্রোতা! আমাকে দুশ্চিন্তায় নিপতিত করো না। হে রাহমান ও রাহীম! তোমার অক্ষম এই বান্দার দুআ কবুল করো। আমরা আমাদের সামনে তোমার শত্রুদের দেখতে পাচ্ছি। আমরা তো কেবল তোমার গোনাহগার বান্দা! আমরা তোমার রহমতের দ্বারের ভিখারী। আমাদেরকে তুমি বেহিসাব করুনা করো! মাবুদ!।তুমি সব কিছু জানো! গায়েবের খবরও তোমার অজানা নয়। হে দিলের খবর সম্পর্কে অবহিত সত্তা! আমি কেবল তোমার সন্তুষ্টি প্রত্যাশি। হে সর্বজ্ঞাতা! আমার প্রার্থনা কবুল করো! শত্রুর সামনে মুসলমানদের লাঞ্চিত করো না! তাদেরকে বিজয়ের সওগাত দান করো! হে দয়াময়! আমাকে তাদের মৃত্যুর কারণ বানায়ো না, বরং তাদের বিজয়ের মাধ্যম বানাও! হে আমার রব! আমি আমার সত্তা তোমার পথে কুরবান করতে চাই। আমি সর্বদা শাহাদতের মৃত্যু প্রত্যাশি। আমি মুসলিম লশকরের কষ্ট দেখতে চাই না! চাই তাদের চেহারায় বিজয়ের হাসি দেখতে। হে আমার প্রতিপালক তোমার পথে আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নাও। আর আমার শাহাদতের মাধ্যমে মুসলিম লশকরকে তুমি বিজয় দান করো!

0 মন্তব্য
2

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!