কুঞ্জালি মারাক্কার: ভারতবর্ষের প্রথম নৌ যুদ্ধের দাপুটে মুসলিম সেনাপতি

by sultan

লেখা পড়ার আগে বলা ভালো, এই মারাক্কারদের নিয়ে বাংলায় কোনো ইতিহাস রচনা হয়নি। হিন্দিতেও বিকৃতভাবে লেখা হয়েছে। একমাত্র মালয়ালাম ভাষা থেকে অনুবাদ করার কারনে সঠিক ইতিহাসটা পাওয়া গেছে।।

ভারতে পর্তুগিজ জলদস্যুদের আগমনের আগে কালিকট রাজ্য ছিলো ভারতের একটি সমৃদ্ধশালী রাজ্য। তখন কালিকট রাজ্য শাসন করতো রাজা জামোরিন (সামুথিরি)। বাণিজ্যিক বন্দর বা ঘাট হিসেবে রাজ্যটির সমৃদ্ধির সুনাম পৃথিবীর নানা দেশে বিস্তৃত ছিল। ফলে পশ্চিমা পর্তুগিজদের লোভনীয় চোখ পড়লো এই বন্দরটির ওপর। তারা হণ্যে হয়ে ভারতে আসার জলপথ আবিস্কারের চেষ্টা করতে থাকলো। ১৪৮৭ সালে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জনের নির্দেশে কিছু জাহাজ তৈরী করা ভারতে বাণিজ্য করার জন্য। আর এই বণিক দলের অধিনায়কত্ব দেয়া হলো ভাস্কো দ্য গামাকে। যাকে আমরা সবাই একজন বিখ্যাত পর্যটক হিসেবে চিনি। যদিও এই ভাস্কো দ্য গামা মূলত একজন পর্যটক নয় বরং অগণিত নিরীহ লোকের হত্যাকারী হিসেবে ভারতবর্ষে বেশি পরিচিক।

নৌবহর ও বণিক দল প্রস্তুত করলেও তখনও ভারতবর্ষে আসার জলপথ পর্তুগিজরা খুজে পায়নি। ঠিক তখনই ভাস্কো দ্য গামা একজন উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন মুসলিম নৌ পরিচালকের খোজ পায়। যিনি হলে বিখ্যাত সমুদ্র বিজ্ঞানী ইবনে মজিদ। এই সেই ব্যক্তি যিনি ভাস্কো দ্য গামাকে পথ দেখিয়ে, নির্দেশনা দিয়ে ভারতবর্ষে নিয়ে আসেন। ইতিহাসের পাতায় ভাস্কো দ্য গামাকে ভারতে আসার জলপথের নায়ক বলা হয়। যা একপ্রকার অতিরঞ্জিত ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ। ভাস্কো দ্য গামা ১৪৯৮ সালের ২০ মে ভারতের দক্ষিণ উপকূল কালিকটের কাছে এসে নামেন। এটাই তার ভারতবর্ষে প্রথম পদার্পণ। ভারতবর্ষের মাটিতে ভাস্কো দ্য গামার হাত ধরে ইউরোপিয় ঔপনিবেশিক দখলদার শক্তির প্রথম বীজটি রোপিত হয়।

জলদস্যু ভাস্কো দ্য গামা

পর্তুগিজ জাহাজগুলো ছিল উন্নত ধরনের। জাহাজের ওপর কামান সজ্জ্বিত ছিল। বন্দরের লোকজন তেমনটি আগে কখনো দেখেনি। তারা অবাক হলো ‘জিনিস’টি কি? তবে সেখানে বসবাসরত আরব বণিকরা কিন্তু কামানের সাথে পরিচিত ছিল। পাশাপাশি সেসময় পর্তুগিজরা ভারতে আসার জলপথ আবিস্কার করতে না পারলেও এত বহু আগেই আরবীয় মুসলিম বণিকরা ভারতের অধিকাংশ এলাকাতেই ব্যবসা-বাণিজ্য করতো। কালিকটের অধিকাংশ ব্যবসাই আরবীয় মুসলিম বণিকদের দ্বারা হতো এবং কালিকটের রাজা আরবীয় বণিকদের সত্যনিষ্ঠ আচরণ, সৎ এবং সাহসী আচরণ দেখে তাদের আপন করে নিয়েছিলেন। রাজা জামোরিনের রাজ্যসভায় অসংখ্য সভাসদ ছিলো আরবীয় মুসলিম। পাশাপাশি জামোরিনের শক্তিশালী নৌ বাহিনীর প্রধানও ছিলো একজন আরবীয় যোদ্ধা। (যাকে নিয়েই আজকের এই লেখা। লেধার ধারাবাহিকতায় আমরা তার সম্পর্কেই জানবো।) তাদের সব ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করেছিলেন। আরবীয় বণিকদের সাথে স্থানীয়রাও ভাইয়ের মতো আচরণ করতো। পর্তুগিজ জাহাজের এই রণসাজ দেখে আরবীয় মুসলিম বণিকরা রাজা জামোরিনকে তাদের সম্পর্কে সাবধান করে দেন এবং জামোরিনকে বোঝান যে, এই পর্তুগিজরা ব্যবসা নয় বরংচ অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কালিকটে এসেছে। মুসলিম বণিক সৎপরামর্শে রাজা জামোরিন পর্তুগিজদের কালিকটে বাণিজ্য করার অনুমতি দিলেও তাদের প্রতি নজর রাখতে থাকেন। এক পর্যায়ে ভাস্কো দ্য গামা রাজা জামোরিনের কাছে এক অন্যায় দাবী করে বসে। সে কালিকটে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি চায়। কিন্তু রাজা জামোরিন শক্তভাবে তা নাকট করে দেন। পরে পর্তুগিজরা বুঝতে পারে যে, আরবীয় মুসলিম বণিকদের এই কালিকট থেকে বিতাড়িত না করলে তারা এই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।

অতঃপর সুবিধা করতে না পেরে কালিকটের সবধরনের তথ্য গোপনে সংগ্রহ করে আবার পর্তুগালে ফিরে যায় ভাস্কো দ্য গামা। পর্তুগালে ফিরে গিয়ে তারা পর্তুগালের রাজাকে মুসলিম বণিকদের বিষয়ে জানানো। ফলশ্রুতিতে পর্তুগালের রাজা কালিকটে হামলার ষড়যন্ত্র করে। এজন্য তারা ৩৩টি জাহাজ ও ১৫০০ যোদ্ধা প্রস্তুত করে। আর এবারের অভিযানের নেতৃত্ব দেয়া হয় পেড্রো আলভারেজ ক্যাব্রোল নামের এক জেনারেলকে। তাকে পর্তুগিজ রাজা ম্যানুয়েল আদেশ দিয়ে পাঠালো যে, কালিকটের রাজার কাছে একটি বাণিজ্য ঘাঁটি স্থাপন ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অনুমতি নিয়ে আসার জন্য। কালিকটের রাজা জামোরিন অনুমতি দেন। কিন্তু পর্তুগিজদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। তারা স্থানীয় লোকদের ওপর অত্যাচার শুরু করলো। দেখতে দেখতে অবস্থার চরম অবনতি হলো। স্থানীয়দের সাথে ক্যাব্রোল বাহিনীর সংঘর্ষ হলো। এক সময় ক্যাব্রোল কামান দিয়ে আক্রমণ শুরু করতে থাকে কালিকট বন্দরে। অবশেষে জামোরিনের বাহিনীর সাহসিক নৌ-যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ক্যাব্রোল তার জাহাজ নিয়ে পালিয়ে গেল। আর এই নৌযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ভুমিকা রেখেছিলো আরবীয় মুসলিম নৌ সেনারা।

কিন্তু পর্তুগিজরা লজ্জাজনক পরাজয়েও পরও থামলো না। ১৫০২ সালে আবারো তারা অভিযান চালালো। এবারের অধিনায়ক হলো সেই কুখ্যাত ‘ভাস্কো দ্য গামা’। সে ২০টি জাহাজ ও ৮০০ জন সুশিক্ষিত সামরিক সৈন্য নিয়ে কালিকট দখল করতে রওনা হলো। শুরু হলো ভাস্কো দ্য গামার বিভীষিকাময় ধ্বংসযজ্ঞের এক কলঙ্কিত অভিযান। ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করেই যে জাহাজেরই দেখা পেলো সে সেগুলো লুটপাট ও ধ্বংস করতে লাগলো। জলদস্যুর মতোই তার নিষ্ঠুরতা ও নৃশংস অত্যাচার অব্যাহত গতিতে চলতে লাগলো। সব থেকে নির্মম কাজটি সে এই সময়েই করে বসলেন। মক্কা থেকে হজ্জ্ব যাত্রীদের নিয়ে কয়েকটি নিরস্ত্র জাহাজ ফিরে আসছিল। জাহাজগুলোকে ভাস্কো দ্য গামা আটক করে মালামাল সব লুট করে নেয়। সৈন্যদের প্রতি তার কঠিন আদেশ ছিল, জাহাজ থেকে যেন কোনো মানুষকে তুলে আনা না হয়। তারপর সেগুলোতে আগুন দেওয়া হয়। জাহাজের সকল যাত্রী পুড়ে কয়লা হয়ে যেতে লাগলো। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু ছিল। কেউ কেউ আবার সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন, কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। ডুবে মরলো অনেকেই। আর যারা ভেসে ছিলেন তাদেরকে সৈন্যরা কুপিয়ে কুপিয়ে মারলো। ভাস্কো দ্য গামা পরম আনন্দে সেই দৃশ্য উপভোগ করলো!

কালিকটে পৌঁছানোর আগেই ভাস্কো দ্য গামার নির্মমতার খবর নগরময় ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মনে পর্তুগিজদের সম্পর্কে ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হলো। কালিকটে পৌঁছে ভাস্কো দ্য গামা রাজাকে জানায়, শহর থেকে সকল মুসলিমকে বের করে দিতে হবে। রাজা জামোরিন তাতে রাজি হলো না। ফলশ্রুতিতে রাজা জামোরিনের সাথে ভাস্কো দ্য দামার যুদ্ধ শুরু হলো। ভাস্কো দ্য গামার কামানের গোলার মুহুর্মুহু আঘাতে শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে থাকে। তারা কিছু ভারতীয় জাহাজ আটক করে কর্মীদের নাক, কান ও হাত কেটে গতবারের যুদ্ধে হারার অপমানের প্রতিশোধ স্বরূপ রাজা জামোরিনের কাছে পাঠালো।

ভাস্কো দ্য গামার অত্যাচার বেশিদিন টিকলো না। কারন সেইসময় ভাস্কো দ্য গামাকে শায়েস্তা করতে আবির্ভূত হলেও জামোরিনের বিখ্যাত মুসলিম নৌ সেনাপতি কাঞ্জালি মারাককার (মূল নাম মুহম্মদ মারাকার বা মুহম্মদ আলী) বা চতুর্থ কুনজালি মারাক্কার। তার সাথে যোগ দিলো সহকারী নৌ সেনাপতি মুহম্মদ কাশিম। কাঞ্জালি মারাকার ও কাশিমের দক্ষ রণনৈপুন্যে একের পর এক পর্তুগিজরা জাহাজ ধ্বংস হয়ে সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। সেদিন নৌ-সেনাপতি কাশিমের রণচাতুর্য ছিল অসামান্য। তিনি ছোট ছোট ক্ষিপ্রগতির জাহাজগুলো এমনভাবে পরিচালনা করতে লাগলেন যাতে ভাস্কো দ্য গামার কামানের গোলা কিছুতেই লক্ষ্য ভেদ না করতে পারে। এমন অভিজ্ঞতা ভাস্কো দ্য গামার কখনো হয়নি। অবশেষে ভাস্কো দ্য গামা জানটা হাতে নিয়ে পর্তুগালে পালিয়ে যায়।

মুহম্মদ কুঞ্জালির ব্যবহৃত তলোয়ার

কুঞ্জালি মারাককার সম্পর্কে কিছু তথ্য:
মারাক্কার উপাধিটি রাজা জামোরিনের দেয়া। এটি একটি মালায়ালাম ভাষার শব্দ। যার অর্থ নৌকা এবং কর, সমাপ্তি-দাপট ইত্যাদি। রাজার নৌবাহিনীতে ৪ জন মুসলিম মারাকার নৌ প্রধান ছিলেন। যাদের নাম পর্যায়ক্রমে-

  • আহমেদ আলী -১ম মারাককার
  • মুহম্মদ কুট্টি পোক্কার আলী -২য় মারাককার
  • মুহম্মদ পত্তে মারাক্কার/পট্টু কুনহালী-৩য় মারাককার
  • মুহম্মদ আলী – কুঞ্জালি মারাক্কার (৪র্থ মারাকার)
চারজন মুসলিম কুঞ্জালির স্বরণে ভারত নৌ বাহিনীর শ্রদ্ধা ফলক

এরপরও কালিকট ও ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে পারেনি। পরে মিশরসহ অনেক আরব দেশ তাদেরকে সহায়তা করলেও পর্তুগিজরা বছরের পর বছর চেষ্টা করে কালিকটের আশেপাশের রাজ্য কোচিন, গুজরাট, গোয়া, বোম্বাই বিজয়নগর দখল করলেও তারা কালিকট দখল করতে পারেনি। আশেপাশের সকল রাজ্য পর্তুগিজদের সহায়তা করেছিল, কিন্তু কালিকটের এই মুসলিম মারাককারদের জন্য কখনোই আর পর্তুগিজরা কালিকট দখল করতে পারেনি।

সুত্র:
https://en.wikipedia.org/wiki/Kunjali_Marakkar

Singh, Arun Kumar (11 February 2017). “Give Indian Navy its due”The Asian Age. Retrieved 6 March 2020.

Indian Pirates. Concept Publishing Company. p. 138. Retrieved 2 March 2012. He walked between three of his chief Muslims: one of them was Chinali “A Chinese who had been a servant at Malacca and said to have been a captive of the Portuguese taken as a boy from a fusta and afterwards brought to Kunhali.” He had conceived such an affection for him that “he treated him with everything.” He was “the greatest exponent of the Moorish superstition and an enemy of the Christians in all Malabar.” It is said of him that for those captured at sea and brought to Kunhali’s little kingdom, he “invented the most exquisite kinds of torture when he martyred them.” This wild assertion of de Couto, lacking corroboration, is apparently incredible.

0 মন্তব্য
2

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!