কুতলুঘ খাতুন: হজ্জ্বের বাসনা রাখা এক মোঙ্গল মুসলিম রাজকন্যা

by sultan

১৩২৩ সালে মামলুক সালতানাতের অধীনে আসে মিশর, সিরিয়া এবং হিজাজ (মক্কা ও মদীনা)। তখন ইরাক এবং ইরান নিয়ন্ত্রন করতো ইলখানাতের মঙ্গোলরা। সে সময় মামলুকদের সাথে ইলখানী মঙ্গোলদের একটি শান্তিচুক্তি হয়। এটি আলেপ্পো চুক্তি নামেও ইতিহাসে মশহুর। যেহেতু সে সময় ইলখানী মঙ্গোলদের অনেক শাসকই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন মূলত তার ভিত্তিতেই এই শান্তিচুক্তি হয়। এই শান্তিচুক্তির ফলে মঙ্গোলদের সাথে ১২৬০ সালে আইন জালুতের যুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ-দ্বন্দের অবসান ঘটে। আইন জালুতের যুদ্ধে মোঙ্গলদের শোচনীয় পরাজয়ের পর মামলুকরা অত্যন্ত শক্তিশালী মুসলিম সেনাবাহিনী হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত হয়েছিলো। ১২৫৮ সালে হালাকু খানের হাতে বাগদাদ ধ্বংসের পর এবং আইন জালুতে মোঙ্গলদের পরাজয়ের পর মামলুকরাই আব্বাসীয় খিলাফতের রক্ষক হয়ে ওঠে এবং তাদের মর্যাদার আসনে বসায়। কার্যত তখন আব্বাসীয়রা মামলুকদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

কুতলুঘ খাতুন

মোঙ্গলদের সাথে মামলুকদের চুক্তিতে বলা হয়েছিলো, ইলখানাতের যারা মোঙ্গল মুসলিম মুসলিম তথা নওমুসলিম তাদের হজ্জ্বে যেতে দিতে হবে। আর এটির নিরাপত্তা প্রদান করবে মামলুক সালতানাত। ইলখানাতের মোঙ্গলরা ইসলাম গ্রহণ করার পর জীবনে একবার হলেও হজ্জ্ব করার ইচ্ছা পোষণ করতো। ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর মোঙ্গল মুসলমানদের হিজাজের দিকে আসা বিপদজনক ছিলো। পরিস্থিতিও বৈরী ছিলো। তাই এই চুক্তি করে তারা। এই চুক্তির পর ইরাক ও ইরানের মোঙ্গল মুসলিমরা কাফেলা তৈরী করে প্রথমে সিরিয়াতে যেতো। সেখানে গিয়ে সিরিয়ান মুসলমানদের বৃহৎ কাফেলার সাথে যোগ দিতো। এরপর একত্রে হিজাজের যেতো হজ্জ্ব করার জন্য।

Abaqa Khan - Wikiwand
শাসক আবাঘা খান

মোঙ্গলদের হজ্জ্বযাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই ইলখানিদ বংশের একজন মোঙ্গল মুসলিম রাজকন্যা তিনি হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। তার নাম কুতলুঘ খাতুন। তিনি শাসক আবাঘা ইলখানের (১২৬৫-১২৮২) কন্যা এবং চেঙ্গিস খানের সরাসরি বংশধর। ঐতিহাসিক আল সাফাদা বলেন, কুতলুঘ খাতুন ছিলেন একজন ইসলামপ্রিয়, সম্মানিত, পর্দানশালী এবং পরহেজগার রাজকন্যা। যদিও তার পিতা আবাঘা এবং তার ভাই অর্ঘুন উভয়ই ছিলো বৌদ্ধ। কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আর তারই ভাতিজা হলো বিখ্যাত মোঙ্গল মুসলিম শাসক গাজান (১২৯৫-১৩০৪)। ঐতিহাসিক আল সাফাদা আরো বলেন, কুতলুঘ খাতুন ঐতিহ্যবাহী মোঙ্গল সংস্কৃতির মধ্যে ইসলামের সংস্কৃতির সংমিশ্রন ঘটিয়েছিলেন এবং তিনি নারী হলেও একজন দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সাহসী ছিলেন এবং ঘোড়সাওয়ারিতে পটু ছিলেন। মোঙ্গল বিধর্মীরাও তাকে অনেক সম্মান করতো।

ঘোড়সাওয়ারীতে পটু ছিলেন রাজকন্যা কুতলুঘ

তিনি হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্যে সফরে বেরিয়ে রমজান মাসে দামেস্কে পৌছেন। তার সাথে ছিলো তার অনেক সেবক নারী ও নিরাপত্তা প্রদানকারী মোঙ্গল মুসলিম সেনা। সে সময় মামলুক গভর্নর তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন। বিখ্যাত তাফসীরকারক ইবনে কাসির (রহ) তিনি সে সময় দামেস্কের একজন তরুণ ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, মোঙ্গল রাজকন্যাকে আবলাক প্রাসাদে বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো এবং তার আপ্যায়নের সমস্ত খরচ মামলুকরা বহন করেছিলো। দামেস্ক থেকে পবিত্র মক্কা নগরীতে যাওয়ার পুরো রাস্তাই অত্যন্ত দর্শনীয় ছিলো। এই রাস্তায় থাকা মরুভূমিতে শিকারও করেছিলেন মোঙ্গল রাজকন্যা। যা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্বরণীয়। তিনি এই শিকারও করেছিলেন নিজের শরীর আবৃত করে। তথা পর্দা করে। সাধারণত সে সময় নারীরা উটে করে হজ্জ্বে যেত। কিন্তু মোঙ্গল রাজকন্যা মামলুক নারীদের থেকে শক্তিশালী ছিলেন। এজন্য তিনি হজ্জ্বের পুরো রাস্তায় ঘোড়ার উপর ভ্রমণ করেছেন। তিনি যাত্রা চলাকালীন প্রচুর পরিমাণে সাদাকাহ (দান) করেন এবং মক্কা ও মদীনায় ৩০ হাজার দিনার দান করেছিলেন।

A woman complaining to the ruler. Illustrations of Ilkhanids in the Diez  Album, an early 14th century copy of Jami' al-Tawa… | Islamic paintings,  Illustration, Diez
কুতলুঘকে অনেক শ্রদ্ধার সাথে স্বাগত জানিয়েছিলো মামলুকরা

রাজকন্যা কুতলুঘের হজ্জ্বের সময় বা পরবর্তী ইতিহাস তেমন আর পাওয়া যায় না। তবে তার সম্পর্কে ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তিনি বলেন, কুতলুঘ একজন ভালো মুসলিমা ছিলেন যিনি মুসলমানদের ভালো পরামর্শ দিতেন। তিনি মুসলমানদের জন্য দরদ রাখতেন। তার মৃত্যু সম্পর্কে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না।

পরিশেষে যে মোঙ্গলরা স্বর্ণের নগরী বাগদাদ ধ্বংস করেছিলো তাদেরই পরবর্তী বংশধরেরা ইসলামে অনেক অবদান রেখেছেন এটাই মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সুত্র:
Brack, Yoni. “A Mongol Princess Making Hajj: The Biography of El Qutlugh Daughter of Abagha Ilkhan (r. 1265-82).” Journal of the Royal Asiatic Society 21, no. 3 (2011): 331-359. Featured image (“Mongols Travelling”) courtesy of Medievalists, originally from 14th century historian Rashīd ad-Dīn’s Jāmi al-Tawārīkh
0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!