নীনা খাতুন: এক উসমানীয় সিংহীর উপাখ্যান

by sultan

নীনাহ খাতুন (১৮৫৭-১৯৫৫)। এক দুর্দান্ত উসমানি বীরাঙ্গনা। সাক্ষাৎ বুভুক্ষু বাঘিনী। রুশ শ্বেতভল্লুকদের যমদূত। রাশানরা আজও এই নামটি শুনলে ভয়ে কুঁকড়ে যায়! আনাতোলিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় আর্জেরুম প্রদেশের ‘আজিজিয়্যাহ’ অঞ্চলের অধিবাসিনী ছিলেন তিনি। আর্জেরুম প্রদেশে ২৩ টি মজবুত দুর্গ ছিল। তন্মধ্যে আজিজিয়্যাহ দুর্গটি ছিল সবচেয়ে মজবুত এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাদেশিক শহর থেকে এটি চার কিলোমিটার দূরে তুব পাহাড়ে অবস্থিত ছিল। পূর্বদিক থেকে উসমানি খিলাফতের সীমান্ত রক্ষায় এই দুর্গ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা রাখত। উসমানি সেনারা এই দুর্গ থেকেই রুশ শ্বেতভল্লুকদের মোকাবেলা করত।

১৮৭৭ সালের এপ্রিল মাস। উসমানি খিলাফত আর রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। খিলাফতের মসনদে তখন সমাসীন সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯)। বলকান ও ককেশাসের কর্তৃত্ব নিয়ে যুদ্ধ চলতে থাকে। সে বছরের নভেম্বরের ৭ তারিখ। রাতের অন্ধকারে রাশানরা আজিজিয়্যাহ দুর্গের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। উসমানি সেনাদের হত্যা করে দুর্গ দখল করে নেয়। দুর্গের নিরাপত্তারক্ষীদের মধ্যে হাসান নামে নীনাহ খাতুনের এক সহোদর ভাই ছিলেন। রাশানদের হামলায় হাসান মারাত্নক জখমি হন। এর পরদিনই হাসান দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।

হামলার দুইদিন পর। ৯ নভেম্বর। ভোরের আলোতে নীনাহ খাতুন কোলের সন্তানের পরিচর্যা করছিলেন। ইত্যবসরে তার কাছে আপন ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পৌঁছায়। এরকম কোনো দুঃসংবাদ শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না নীনাহ খাতুন। খবর শুনতেই, তিনমাসের দুগ্ধপায়ী কন্যাসন্তানকে ফেলে রেখে, দুর্গ অভিমুখে ছুটলেন ঊর্ধ্বশ্বাসে। ভাই হারানোর এবং শিশু সন্তান ফেলে আসার বিরহে তার গাল বেয়ে ঝরে পড়ছিল ফোঁটা ফোঁটা তপ্ত আশ্রুমালা।

দৌড়াতে দৌড়াতে দুর্গে এসে পৌঁছলেন নীনাহ খাতুন। অশ্রুসিক্ত নয়নে ভাইয়ের রক্তমাখা মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। চিরতরের জন্য ঘুমন্ত ভাইয়ের ললাটে চুমো এঁকে দিলেন। এরপর লাশ ছুঁয়ে কসম খেলেন প্রতিশোধের! ভাইয়ের মৃত্যুর, দেশ ও দশের পক্ষে প্রতিশোধের! কালবিলম্ব না করে তিনি নিহত ভাইয়ের বন্দুক হাতে উঠালেন। আরেক হাতে কুড়াল নিলেন। স্থানীয় বিপ্লবী জনগণের সাথে রুশ শ্বেতভল্লুকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ইমান-ইসলাম ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে এবং উসমানি সৈন্যদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে স্থানীয় উসমানি জনগণ রাশানদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই লড়াই শুরু করে দিয়েছে।
লড়াকু উসমানি জনগণের বেশিরভাগ ছিল নারী ও বয়স্ক লোক! মুসলিম ছাড়াও ছিল খ্রিষ্টান, ইয়াহুদি ও অন্যান্য ধর্মালম্বী। অস্ত্র হিসেবে সকলের হাতে ছিল দা, কুড়াল, খুন্তি ইত্যাদি দেশীয় হাতিয়ার! বিপরীত দিক দিয়ে রাশানরা ছিল বন্দুক, গোলা-বারুদ ও তীর-ধনুক ইত্যাদি অস্ত্রে সজ্জিত। অল্পক্ষণের মধ্যেই রাশানরা চোখে শর্ষেফুল দেখতে পেল! এক একটা লোক তাদের জন্য মৃত্যুদূত হিসেবে আবির্ভূত হলো! এদের প্রত্যেকেই যেন অসীম সাহস ও সীমাহীন শক্তির পর্বত! অবশেষে রাশানরা পরাজিত হলো। উসমানি জনগণ দুর্গ পূণরায় দখল করে নিল। প্রায় দুই হাজার রুশ শ্বেতভল্লুক দুনিয়া ত্যাগ করল দা, কুড়াল, খুন্তির এলোপাতাড়ি আনাড়ি আঘাতে! রুশ শ্বেতভল্লুকদের গুলি-বৃষ্টিতে কয়েকশো লড়াকু উসমানি জনগণ শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করল।

শেষ হয়ে গেল লড়াই। অগণিত লাশ ফেলে রেখে রুশ শ্বেতল্লুকেরা ময়দান ছেড়ে পালিয়েছে। পুরো ময়দানের এখানে-ওখানে স্থানীয় উসমানি জনগণের মরদেহ পড়ে আছে। সকলেই যার যার নিকটজনের খুঁজে বের হলো। কিন্তু নীনাহ খাতুনের কোনো খুঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। হঠাৎ তার খুঁজ মিলল। নীনাহ খাতুনকে চেতনাহীন অবস্থায় পাওয়া গেল। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত। দেখা গেল, এই কঠিন মুহূর্তেও রক্তেরঞ্জিত দুহাতে শক্ত করে কুড়াল আগলে ধরে রেখেছেন! গাজিদের ভাষ্যমতে, পুরো লড়াইয়েই নীনাহ খাতুন সকলের আগে আগে ছিলেন। ভাইয়ের পরিত্যক্ত বন্দুক আর কুড়াল নিয়ে বীরত্বের নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন।

১৯৫২ সালে আমেরিকান জেনারেল ‘রেড জেই’ তুরষ্ক ভ্রমণে গিয়েছিলেন। বীরাঙ্গনা নীনাহ খাতুনকে একনজর দেখার কৌতুহল তিনি দমন করতে পারলেন না। অবশেষে তার সাথে দেখা করলেন। সাক্ষাতে রেড জেই নীনাহ খাতুনকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যদি সম্ভব হয়, তাহলে আপনি কি নতুন কোনো যুদ্ধে শরীক হবেন?’ নীনাহ খাতুন অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই শরীক হব!’

ইসলাম ও উসমানি খিলাফতের জন্য নীনাহ খাতুনের ত্যাগ অপরিসীম। তার স্বামী উসমানি খিলাফতের পক্ষে লড়তে গিয়ে কোনো একটি যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জানাক কেল্লা যুদ্ধে তার ছেলে ইউসুফ শহিদ হন।

১৯৫৫ সালের ২২মে ৯৮ বছর বয়সে নীনাহ খাতুন মৃত্যুবরণ করেন। আজিজিয়্যাহ দুর্গসংলগ্ন কেন্দ্রীয় শহিদি গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়। তার বীরত্বপূর্ণ জীবনী নিয়ে ১৯৭৩ সালে ‘গাজি কাদিন নীনাহ খাতুন’ নামে তুরষ্কে ফিল্ম নির্মিত হয়। তদ্রুপ ২০১০ সালেও আরেকটি ফিল্ম নির্মিত হয়। তুর্কি ইতিহাসে তিনি ‘উম্মুল জাইশিস সালিস’ বা তৃতীয় সেনাদলের মাতা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৫৫ সালের বিশ্ব মা দিবসে ‘উম্মুল উম্মাহাত’ বা ‘সকল জননীর জননী’ উপাধিতেও ভুষিত হন।

সূত্রাবলি:
০১- Cassell’s Illustrated History of the Russo-Turkish War of 1877–1878, পৃষ্ঠা: ৫০৬, উলিয়ন এডমুন্ড।
০২- তুর্কপ্রেস ডট কম, https://www.turkpress.co/node/47950
০৩- উইকিপিডিয়া, https://ar.m.wikipedia.org/wiki/نينه_خاتون
০৪- আইনুল হক কাসেমী (শ্রদ্ধেয় ভাই)

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!