বলকান যুদ্ধে উসমানীয় খিলাফতকে পাকিস্তানী, বাঙালি ও ভারতীয় মুসলিমদের সহায়তার ইতিহাস

by sultan

১৯২১ সালে সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো, বুলগেরিয়া এবং গ্রিস একসাথে উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধে প্রত্যেক পক্ষেরই ব্যাপক বিপর্য সংঘঠিত হয়। খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর বুলগেরিয়া থেকে তুর্কি ভাষাভাষিদের বের করে দেয়া হয়। সময়টা তখন ছিলো কলেরার। ফলে বুলগেরিয়া থেকে বিতাড়িত হওয়া তুর্কিরা কলেরায় আক্রান্ত হয় এবং সে অবস্থাতেই তারা ইস্তাম্বুলে চলে আসে। পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলবাসীরা ব্যাপক হারে কলেরায় আক্রান্ত হয়। একদিকে যুদ্ধ অন্যদিকে কলেরার প্রকোপ-উভয়সঙ্কটে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো উসমানীয়রা। আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য উসমানীয় প্রশাসন গঠন করে রেড ক্রিসেন্ট গ্রুপ। যার নাম দেয়া হয়েছিলো ‘হিল্লাল-ই-আহমার’। উসমানীয় খিলাফতের এই কঠিন মুহুর্তে এগিয়ে আসে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা। এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ভারতীয় উপমহাদেশের (বর্তমান বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত) মুসলমানরা অর্থ সংগ্রহ করে উসমানীয় খিলাফতের চিকিৎসা ফান্ডে পাঠিয়েছিলো।

ইস্তাম্বুলে যাওয়া ভারতীয় মুসলিম চিকিৎসক দল (তৃতীয় সারিতে, বাম থেকে দ্বিতীয় হলেন মুহম্মদ মুহতার আনসারী। ইস্তাম্বুলে যেতে তিনি তার জীবনের জমানো সব অর্থ খরচ করে দিয়েছিলেন এবং জীবনের শেষ ক্ষন পর্যন্ত খিলাফতকে সহযোগীতা করেছিলেন

তৎকালীন সময়ে উসমানীয় খিলাফত অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু এরপরও ভারতীয় মুসলমানরা খিলাফত হিসেবে মান্য করতো তুর্কিদের। ফলে খিলাফতের সঙ্কটময় মুহুর্তে অর্থ্ সংগ্রহের জন্য ভারতীয় মুসলিমরা এতটাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো যে, ভারতীয় মুসলিম শিক্ষার্থীরা তাদের খাবারের রেশনের সিংহভাগ জমিয়ে এবং ভারতীয় মুসলিম বোনেরা তাদের সোনা-গহনা বিক্রি করে সেই অর্থ্ খিলাফতের চিকিৎসা ফান্ডে পাঠিয়েছিলো। উসমানীয় রেড ক্রিসেন্ট ফাউন্ডেশনে ভারতীয় মুসলিমদের পক্ষে থেকে প্রায় ১৮৫,০০০ অটোম্যান লিরা প্রদান করা হয়েছিলো।

শুধু তাই নয়, ১৯১২ সালে উপমহাদেশের বিখ্যাত কবি আল্লামা ইকবাল লাহোরের বাদশাহী মসজিদে তার বিখ্যাত কবিতা ‘জাবাব ই শাকওয়া’ আবৃত্তি করেছিলেন এবং বলেছিলেন ‘সময় এসেছে বলকান যুদ্ধে উসমানীয় বাহিনীকে সহযোগীতা করার’। এসময় তিনি উসমানীয় ঐতিহ্যৃবাহী পোশাক পরিধান করেছিলেন। তার এই আহবানে প্রায় ২০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী যুবক খিলাফতের জন্য তহবিল সংগ্রহে নিয়োজিত হয়। এসময় ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক বিখ্যাত চিকিৎসক তুর্কিতে যায় খিলাফতকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করার জন্য। যেসব স্বাস্থ্যকর্মী যেসময় তুরস্কে গিয়েছিলেন তারা জান-প্রাণ দিয়ে তাদের সর্বোচ্চ সেবাটুকু প্রদান করেছিলেন। এই চিকিৎসকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডঃ মুহতার আহমেদ আনসারী, যিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ৩ জন করে চিকিৎসকদের প্রায় ৬টি টিম গিয়েছিলো বলকান যুদ্ধে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করার জন্য।

তহবিল সংগ্রহের জন্য ভাষণ দিচ্ছেন আল্লামা ইকবাল

এই টিমগুলোর অন্যতম চিকিৎসক মুহম্মদ আলী এবং জাফর খান একত্রে অর্থায়ন করে একটি প্রকল্প তৈরী করেছিলেন যে প্রকল্পে বুলগেরিয়া থেকে চলে আসা অসহায় মুসলিম তুর্কিদের আনাতোলিয়ায় থাকার জন্য ঘর তৈরী করা হয়। ভারতীয় মুসলমানদের এই সহায়তা শুধু বলকান যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলোনা, পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তুরস্কের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ও অব্যাহত ছিলো। এই চিকিৎসক টিমের মধ্যে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী ছিলেন যারা ভারতের ধনী পরিবারগুলো থেকে এসেছিলেন। তারা ভারত থেকে যাওয়া সকল চিকিৎসকদের সকল প্রকার খরচ বহন করেছিলেন। পাশাপাশি মিশর থেকে ইস্তাম্বুলে আসা বিখ্যাত চিকিৎসক সেলিমেরও ব্যয় বহন করেছিলেন।

তৎকালীন ভারতবর্ষের বিশিষ্ট চিকিৎসক মুহতার আহমেদ আনসারী ও মুহম্মদ আলী জওহর
রোহিঙ্গা জনগণ ১৯১৩ সালে বলকান যুদ্ধে আহত তুর্কি জনগণের ত্রাণার্থে অটোমানদের কাছে ১,৯৯১ পাউন্ড প্রেরণ করেছিল
বার্মিজ মুসলমানরা ২২০ স্টারলিনসহ এই চিঠিটি তৎকালীন মিয়ানমারের অটোম্যান কনসুলেটে প্রদান করে এবং পরবর্তীতে তা ইস্তাম্বুলে প্রেরণ করা হয়
উসমানীয় সৈন্যদের হতাহত হওয়ার সংবাদে কাঁদছে ভারতের মুসলিম শিক্ষার্থীরা
বাঙালি মুসলমানদের পক্ষ থেকে পাঠানো অর্থের ডকুমেন্ট।
ভারতের মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ তহবিল ক্যাম্প।

সুত্র:
অটোম্যান এমপেরিয়াল আর্কাইভ
http://heritagetimes.in/

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!