ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন (২): রাজা দাহিরের সিন্ধু বিজয় হলো মুসলিমদের অভিযানে

by sultan

ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই আরব বণিকগণ ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতাে। আরবে দ্বীন ইসলাম এসে পুরো আরবজাতিকে আলোকিত করার পরও এই ধারা অব্যাহত থাকে। আরব মুসলিম নাবিকদের অনেকেই উপমহাদেশের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। স্থানীয় যেসব নারী ইসলামের মহত্বে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতো তাদেরকে বিবাহ করেন তারা। এভাবে কালক্রমে তারা বেশ কয়েকটি উপনিবেশ গড়ে তােলে। কিন্তু দ্বীন ইসলাম আসার প্রায় একশ বছর পর ভারতে মুসলমান শাসনের গােড়াপত্তন হয়।

১ম পবের্র পর..
হাজ্জাজ বিন-ইউসুফ সিন্ধু বিজয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন।  তিনি ওবায়দুল্লাহ ও বুদাইলের নেতৃত্বে পর পর দুটি অভিযান পাঠালেন।  কিন্তু দুটি অভিযানই ব্যর্থ হল।  এতেও হাজ্জাজ দমলেন না।  তিনি তৃতীয় অভিযান পাঠালেন।  এই অভিযানের নেতৃত্ব দিলেন তাঁর ভ্রাতুস্পুত্র ও জামাতা মুহম্মদ বিন-কাসিম (রহ:) কে ।  মুহম্মদ বিন-কাসিমের বয়স তখন মাত্র সতেরাে বছর।  আগের দুটি অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় এবার হাজ্জাজ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।  মুহম্মদের সৈন্যবাহিনী তে ছিল ৬০০০ পদাতিক, ৬০০০ উষ্ট্রারােহী, ৩০০০ তীরন্দাজ এবং ৩০০০ ভারবাহী পশু।  তরুণ সেনানায়ক ছিলেন অসীম মনােবলের অধিকারী।  নেতৃত্ব দেয়ার সকল গুণাবলীই তাঁর ছিল।  মুহম্মদ মাকরানের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হলেন।  মাকরানের শাসকের সাথে তিনি বন্ধুত্ব গড়ে তােলেন।  মাকরানের শাসক মুহম্মদকে আরও একটি সৈন্যবাহিনী দিয়ে সাহায্য করেন।  রাজা দাহিরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জাঠ ও মেডগণও মুসলমানদের পক্ষে যােগ দেয়। মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য হাজ্জাজ নৌপথেও একদল সৈন্য পাঠান।  ‘বলিস্ত’ নামক একপ্রকার যন্ত্রও হাজ্জাজ পাঠিয়েছিলেন।  বলিস্ত ছিল এক ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র।  এই যন্ত্র দিয়ে ভারী পাথর দূরে নিক্ষেপ করে আঘাত করা যেতাে।

তৎকালীন বিশ্ব ম্যাপে সিন্ধুর অবস্থান

মুহম্মদ বিন-কাসিম প্রথমেই দাইবুল বন্দর অবরােধ করেন।  ব্রাহ্মণ ও রাজপুতরা দাইবুল রক্ষার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুহম্মদ বিন-কাসিম ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান সেনানায়ক।  দাইবুলের প্রধান মন্দিরের চূড়ায় একটি লাল নিশান উড়ানাে ছিল।  মুহম্মদ বিন-কাসিম বলিস্ত দিয়ে পাথর ছুড়ে নিশানটি নামিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।  নিশানটি নামিয়ে ফেলা হলে হিন্দুদের মনােবল ভেঙ্গে পড়ে।  তাদের ধারণা ছিল মন্দিরের চূড়ায় যতক্ষণ নিশান উড়বে ততক্ষণ বাইরের কোন শত্রু দাইবুল দখল করতে পারবে না।  যাহােক, হিন্দুরা অসীম সাহসে যুদ্ধ করলাে।  কিন্তু মুসলমানদের উন্নত রণকৌশলের কাছে তারা পরাজিত হলাে।  দাইবুল এলাে মুসলমানদের দখলে।  দাইবুল দখলের পর মুহম্মদ বিন-কাসিম সিন্ধু নদের তীর ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে চললেন।  তিনি নীরুন, সিওয়ান ও সিসাম শহরগুলাে একের পর এক দখল করে নিলেন।  এগুলাে দখল করতে তাঁকে তেমন কোন বাধার মুখােমুখি হতে হয়নি।  কিন্তু রাওয়ার দুর্গ দখলের ব্যাপারে মুহম্মদ বিন-কাসিমকে প্রচন্ড বাঁধার মােকাবেলা করতে হয়। এখানে রাজা দাহির এক বিশাল সৈন্যবাহিনীর সমাবেশ ঘটায়। মুহম্মদ বিন-কাসিম নৌকার সেতু তৈরি করে সিন্ধু নদ পার হন। অতঃপর দাহিরের বাহিনীর সাথে মুসলমানদের প্রচন্ড যুদ্ধ হয়।  রাজা দাহির যুদ্ধ করে যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ ত্যাগ করে।  রাজার মৃত্যুতে হিন্দু সৈনিকগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং সবাই পালিয়ে যায়।  রাওয়ার দুর্গ মুহম্মদ বিন-কাসিমের দখলে এলাে।  রাওয়ার দখলের পর মুহম্মদ বিন-কাসিম ব্রাহ্মণাবাদ দখল করেন। এরপর সিন্ধুর রাজধানী আলাের দুর্গের পতন ঘটে।  আলাের রক্ষার দায়িত্বে ছিলো দাহিরের এক পুত্র। আলাের জয় করে মুহম্মদ সিন্ধু অঞ্চলে সুশাসনের ব্যবস্থা করেন।

রাজা দাহিরকে পরাজিত করলেন মুহম্মদ বিন কাশিম

আলোর দখলের পর মুহম্মদ বিন কাশিম আরো উত্তরে অভিযান পরিচালনা করে মুলতান জয় করেন।  মুলতানের পথে তিনি রাভী নদীর তীরে অবস্থিত উচ দখল করেন।  মুলতান দখল করতে মুসলমানদের বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো।  হিন্দুরা মুলতান রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়।  তারা প্রায় ২ মাস মুলতান দুর্গ রক্ষায় সক্ষম হয়।  অবশেষে তাদের সকল বাধা-বিপত্তি চুর্ণ করে দিয়ে মুহম্মদ বিন কাশিম মুলতান বিজয় করতে সক্ষম হন।  মুলতান বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাজা দাহিরের গোটা রাজ্যই মুসলমানদের অধীনে চলে আসে।

সিন্ধু বিজয়ের পর মুহম্মদ বিন-কাসিম সেখানকার শাসনকর্তার দায়িত্ব লাভ করেন।  তিনি ৭১২ থেকে ৭১৫ পর্যন্ত এই দায়িত্বে নিয়ােজিত ছিলেন।  সিন্ধু-মুলতানে তিনি দক্ষ ও সুন্দর শাসন ব্যবস্থা গড়ে তােলেন।  ওদিকে ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের মৃত্যু হয়।  পরবর্তী খলিফা সােলায়মান আল ওয়ালি ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে মুহম্মদ বিন কাশিমের প্রতি বিরুপ আচরণ শুরু করে।  নতুন খলিফা মুহম্মদকে দামেস্কে ডেকে পাঠান।  সেখানে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়।  কারাগারেই মৃত্যু ঘটে ইসলামের বীর এই সিপাহসালার।  মুহম্মদ বিন-কাসিমের অকাল মৃত্যুর ফলে তাঁর বিজয় সিন্ধু ও মুলতানেই সীমাবদ্ধ থাকে। 

সিন্ধু বিজয়ের ফলাফলঃ
একথা সত্য যে মুহম্মদ বিন-কাসিমের বিজয় শুধুমাত্র সিন্ধু ও মুলতানেই সীমাবদ্ধ ছিল।  কিন্তু তাই বলে এ বিজয়কে নিষ্ফল বলা যায় না।  আরবরা সিন্ধু অঞ্চলে এক উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তােলে।  আল-ওয়ালিদের পরবর্তী উমাইয়া শাসকদের আমলে এবং আব্বাসীয় আমলে সিন্ধুতে মুসলমান শাসন অব্যাহত ছিল।  আরব সৈন্যদের মধ্যে অনেকেই সিন্ধুতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে।  তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থানীয় রমণী বিয়ে করে।  এভাবে ভারতে একটা স্থায়ী মুসলমান বসতি গড়ে উঠে।  তারা রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও অন্যান্য দালান-কোঠা নির্মাণ করে।  আরব বংশধর ও হিন্দুগণ দীর্ঘকাল পাশাপাশি বসবাস করে।  একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মুহম্মদ বিনকাসিমের বিজয় সুলতান মাহমুদকে বারবার ভারত অভিযানে অনুপ্রাণিত করেছিল। সুলতান মাহমুদের পর মুহম্মদ ঘােরী ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করেন।  মুহম্মদ বিন-কাসিমের বিজয়কে ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ভারতে দীর্ঘস্থায়ী মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। 

সিন্ধুতে মুহম্মদ বিন কাশিমের নির্মাণ করা একটি মসজিদের ভগ্নাংশ

সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফলাফলঃ
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সিন্ধু বিজয়ের সুদূরপ্রসারী ফলাফল লক্ষ করা যায়।  স্থানীয় অধিবাসীগণ মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে।  তারা ইসলামের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ দ্বারা আকৃষ্ট হয়।  জাঠ ও মেডগণ এজন্যই মুসলমানদের স্বাগত জানিয়েছিল।  হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথা এবং সামাজিক অবিচার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নিম্নশ্রেণীর হিন্দুগণ দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়।  মুসলমানদের সংস্পর্শে আসার ফলে ভারতীয় সমাজের বর্ণভেদ ও জাতিভেদ প্রথার কঠোরতা বহুলাংশে হ্রাস পায়।  এই বিজয়ের ফলে উমাইয়া খিলাফতের সাথে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।  ফলে দু’পক্ষই অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হয়।  শুধু তাই নয় এর ফলে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার উপকূলে আরবদের সামুদ্রিক বাণিজ্য সুদূর প্রসারী হয়।সাংস্কৃতিক ফলাফল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল ছিল সর্বাপেক্ষা সুদূর প্রসারী।  মুসলমানরা ভারতবর্ষে গিয়ে দর্শন, সাহিত্য, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, চিত্রশিল্প প্রভৃতিতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে।  ফলে ইসলামী কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে ভারতীয় জনগন ব্যাপকভাবে পরিচিত ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।  যার ব্যক্তি আজ পর্যন্ত রয়েছে।  আব্বাসীয় খলীফাগণ ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই-পুস্তক আরবি ভাষায় অনুবাদ করার ব্যবস্থা করে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলেন।  উদাহরণ হিসেবে ‘সিহিন্দ’ নামক গ্রন্থের কথা উল্লেখ করা যায়। খলিফা মনসুরের সময় কয়েকজন ভারতীয় পন্ডিত বাগদাদ যায়।  তারা সাথে করে নিয়ে যায় জ্যোতির্বিদ্যার উপর সিদ্ধান্ত নামক সংস্কৃত গ্রন্থটি। আরবীয় পন্ডিতগণ এটি আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন। অনূদিত গ্রন্থটির নামকরণ করা হয় ‘সিহিন্দ’।  (চলবে)

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

0 মন্তব্য
1

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!