ভারতীয় সিনেমায় আহমেদ শাহ আবদালী নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রকৃত সত্য -১

by sultan

সম্প্রতি পানিপথ নামের একটি ভারতীয় সিনেমায় মারাঠাদের বিপরীতে আফগানিস্তানের মহান শাসক আহমেদ শাহ আবদালীকে বর্বর, হিংস্র এবং অর্থলোভী হিসেবে দেখানো হয়েছে। যার কোনো অস্তিত্ব ইতিহাসে পাওয়া যায়না। মুসলিমবিদ্বেষবশত এইসব মিথ্যা ঘটনাপ্রবাহ সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে। যদিও তৎকালীন সময়ে এইসব যুদ্ধ ছিলো অনেক রাজনৈতিক আবার অনেকটা ধর্মীয়। ভারতীয় পানিপথ সিনেমায় মারাঠাদের যেরকম সাধু হিসেবে দেখানো হয়েছে প্রকৃতপক্ষে মারাঠারা অনেক গুনে হিংস্র ছিলো তৎকালীন সময়ে। সেটা অন্য এক আর্টিকেলে বর্ননা করবো। অনেক মুসলমান ভাইও আহমেদ শাহ আবদালীকে বর্বর হিসেবেই স্বীকার করছেন। যা সত্যিই হতাশাজনক। মুসলিম শাসকদের বিকৃত ইতিহাস পড়েই আজকের যুবসমাজ সঠিক ইতিহাস থেকে দুরে থাকছে। চলুন এবার তাহলে আফগানিস্তানের বীর যোদ্ধা আহমেদ শাহ আবদালী সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে আসি-

আফগানিস্তানের ইতিহাসে আহমদ শাহ আবদালি এক অনন্য নাম। আধুনিক আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাকে সম্মান করা হয়। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন পারস্যরাজ (ইয়ানরাজ) নাদির শাহের সেনাপতি এবং পরবর্তীকালে প্রতিভাবলে তিনি আফগানিস্তানের রাজা হন। ১৭৪৭-১৭৭২ সালে তিনি স্বাধীন রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি আটবার ভারত আক্রমণ করেন। ১৭৫৬ সালে তিনি পাঞ্জাব, কাশ্মির, সিন্ধু প্রভৃতি মুঘল এলাকা দখল করেন। পুত্র তাইমুরকে তিনি এসব এলাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। পরে অরাজকতা দেখা দিলে মারাঠারা তাইমুরকে বিতাড়িত করে দখল করে নেয় লাহোর। এতে নেতৃত্ব দেয় রঘুনাথ রাও। পরে আহমদ শাহ আবদালি আবার ভারত আক্রমণ করেন এবং পাঞ্জাবে দখলদারিত্ব কায়েম করেন। ১৭৬১ সালে তিনি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে বিশাল মারাঠা বাহিনীকে হারিয়ে দেন। দুররানি বংশ ও দুররানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। অনেক মুঘল এলাকা দখল করলেও তিনি দ্বিতীয় শাহ আলমকে ভারতের সম্রাট বলে গণ্য করতেন। আফগানদের কাছে এখনো তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়।

আবদালীর মুসলিম বাহিনী বনাম সদাশিব রাওয়ের মারাঠা বাহিনী:

সম্রাট আঙরঙ্গজেবের পর ১৬৮০ থেকে ১৭০৭ ছিল মোঘল সমারাজ্যের পতন এবং মারাঠা শক্তির উত্থান হয়। পেশোয়া বাজি রাওয়ের নেতৃত্বে গুজরাট, মালওয়া এবং রাজপুতনা মারাঠা নিয়ন্ত্রনে আসে। ১৭৩৭ সালে দিল্লী উপকন্ঠে মোঘলদের পরাজিত করে বাজি রাও দিল্লীর দক্ষিনাংশ মারাঠাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসেন। ১৭৫৮ সালে বাজি রাওয়ের ছেলে বালাজি রাও পান্জাব আক্রমন করে মারাঠা সম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি করে। এটা ছিল সরাসরি আফগানিস্থানের দুররানী সামরাজ্যের বাদশাহ আহমদ শাহ আবদালীর সাথে সংঘর্ষ।

আহমেদ শাহ আবদালী পশতুন এবং মারাঠা উপজাতি থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে পাজ্ঞাবে তার জোট তৈরি করলেন। তারপর তিনি ভারতের স্থানীয় মুসলিম নবাবদের দ্বারা শাসিত রাজ্যগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে এক বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলেন মারাঠাদের উচিত শিক্ষা দিতে। মারাঠারা সাধাশিব রাও এর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হল। তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫০০০- ৬০০০০ হাজার। তাদের সাথে প্রায় দু লক্ষ লোক ছিল যারা যোদ্ধা ছিল না। এদের মধ্যে বড় একটি সংখ্যা এমন ছিল যারা মূলত উত্তর ভারতের হিন্দু তীর্থস্থান গমনেচ্ছুক ছিল। ১৭৬০ সালের ১৪ই মার্চ মারাঠারা উত্তর অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা শুরু করে। উভয়পক্ষ অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলাকে তাদের সাথে পেতে চেষ্টা করল। জুলাইয়ের শেষের দিকে সুজাউদ্দৌলা আফগান-রোহিলা জোটের সাথে মিলিত হয় মুসলিম সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে। এটি ছিল কৌশলগতভাবে মারাঠাদের বিরাট পরাজয়।
আফগান বাদশাহ আহমেদ শাহ আবদালীল নেতৃত্বে রোহিলা অধিপতি নজিবুদ্দৌলা এবং অযোধ্যার অধিপতি সুজাউদ্দৌলা ঐক্যবদ্ধ হলেন মারাঠাদের সাম্রাজ্য বিস্তার রুখতে। ১৭৬০ সালের পহেলা আগস্ট মারাঠারা দিল্লী পৌছাল। এবং দ্বিতীয় দিন শহর দখল করে নিল। যমুনা নদীর তীরে বিচ্ছিন্ন একটি যুদ্ধে মারাঠারা জয় লাভ করল । এসময় আবদালী এবং মূল সৈন্যদল ছিল যমুনার পূর্ব দিকে।

২৫ অক্টোবর আবদালী যমুনা নদী পার হয়ে দীর্ঘ দুই মাসব্যাপী মারাঠাদের পানিপথ শহরে অবরোধ করে রাখলেন। এই অবরোধের সময় উভয়পক্ষ চেষ্টা করে শত্রুপক্ষের রসদ সরাবারহ লাইন বিচ্ছিন্ন করার । এ বিষয়ে আফগানরা অবশেষে সফল হয়। তারা মারাঠাদের খাদ্য সরবারহ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ১৭৬১সালের ১৩ই জানুয়ারী মারাঠা সর্দার তার কমান্ডারদের একত্র করলেন, তিনি আনাহারে না মরে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃতু্ বরন করতে বললেন। পরের দিন ভোর হওয়ার আগেই তাদের শিবির থেকে বের হল এবং অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করল। সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলল। যুদ্ধ কয়েকদিন ব্যাপী স্থায়ী হয়। এবং উভয় পক্ষের বহু সংখ্যক হতাহত হয়। যুদ্ধের পর বহু মারাঠা সৈন্য বন্দী হয়। পরবর্তীতে মারাঠা সাম্রাজ্য টুকরো হয়ে কতগুলো রাজ্যে বিভক্ত হয়।

মিথ্যাচারের জবাবগুলো পরবর্তী পর্বে আসছে…….

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!