ভারতের প্রথম মুসলিম সম্প্রদায় মোপলা বীরদের ইতিকথা

by sultan

বিচিত্র ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ভরপুর ভারতীয় উপমহাদেশ। লাখো সংস্কৃতির ভীড়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা দখল করে রেখেছে কেরালার মাপিলা সংস্কৃতি। ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই আরব বিশ্বের সাথে মাপিলাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং সম্পর্কের কারণে ভারতবর্ষের অন্যান্য মুসলিম জাতিগোষ্ঠী থেকে মাপিলারা একেবারেই আলাদা। এই মাপিলাদের সাধারণত মোপলা বলেই বিবেচিত করা হয় এবং এই জাতিগোষ্ঠীটির অধিকাংশ মানুষই মুসলমান। এই মোপলারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, পাশাপাশি কেরালা এবং সর্বভারতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তাদের ভূমিকা অপরিসীম।

ঐতিহ্যবাহী মাপিলা সংস্কৃতি

মাপিলা কারা?
মাপিলা বা মোপলা শব্দটি প্রাচীন দ্রাবিড় ভাষা থেকে এসেছে এবং এর অর্থ “মহান শিশু”। এই শব্দটির উৎপত্তির বিষয়ে অনেক মত রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, মাপিলা মুসলমানরা অধিকাংশই আরব ব্যবসায়ীদের বংশধর যারা ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য পথের মাধ্যমে ভারতের দক্ষিণ -পশ্চিম উপকূল (মালাবার কোস্ট নামে পরিচিত) ভ্রমণ করেছিলেন। তৎকালীন সময় মালাবার উপকুলে ব্যবসা করতে আসা আরবী বণিকদের অনুকরণীয় চরিত্র ও অসীম সমতা তৎকালীন হিন্দু শাসকদের মুগ্ধ করেছিলো। ফলে সেখানকার বহু মানুষ দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। স্বাভাবিকভাবেই দ্বীন ইসলাম গ্রহণকারীদের মেয়েদের সাথে আরব ব্যবসায়ীদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আরব বণিকরা যেহেতু মালাবারের মানুষদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিল এজন্য তাদের জন্ম নেয়া সন্তানদের নাম দেয়া হয়েছিলো মাপিলাস বা মহান শিশু। অনেক আরব মুসলমান এই এলাকায় ব্যবসার উদ্দেশ্যে এসে স্থানীয় নওমুসলিম মহিলাদের বিবাহ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলো। ফলে মালাবার অঞ্চলে খুব দ্রুতই প্রসার হয় দ্বীন ইসলামের। আরব বণিকরা যে শুধু এই অঞ্চলে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যেই এসেছিলো তা নয়। বরং তারা নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্যের পাশাপাশি এ অঞ্চলের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যা স্থানীয়দের সাথে তাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে।
ঐতিহাসিক বিভিন্ন নথীপত্র এটাই বলে যে, দ্বীন ইসলাম কেরালা হয়েই ভারতে প্রবেশ করে এবং এই মাপিলা বা মোপলারাই হচ্ছে ভারতের প্রথম মুসলিম সম্প্রদায়। ভারতীয় ঐতিহাসিক এমজিএস নারায়ন তার ‘কেরালাস পেরুমাল’ বইয়ে বলেছেন, কেরালার রাজা চেরামান পেরুমল ছিলেন ভারতের প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন এবং তিনি সরাসরি নবীজী (সাঃ) এর কাছ থেকে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে রাজা পেরুমালের ইসলাম গ্রহণের সঠিক তারিখ এবং সময়কাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে এটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, ভারতের উত্তরাঞ্চলে ইসলাম আসার অনেক আগেই কেরালায় ইসলামের আগমণ ঘটেছিলো এবং খুব দ্রুত তার প্রসার ঘটেছিলো। আর এর কারণেই ভারতের প্রথম মসজিদ কেরালার কোডুঙ্গাল্লুরের চেরামান পেরুমাল জুমা মসজিদ। যা ৬২৯ সালে নির্মিত হয়। এই মসজিদের অনন্য স্থাপত্য উত্তর ভারতে পাওয়া অন্যান্য মসজিদের ফার্সি/মুঘল স্থাপত্যের থেকে আলাদা, এটি ভারতের মধ্য এশীয় আক্রমণের আগে ইসলামের আবির্ভাবের জীবন্ত প্রমাণ।

চেরামান পেরুমাল জুমাহ মসজিদ

মাপিলাদের বৃদ্ধি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের ভূমিকা

কেরালা আজ ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য পরিচিত। এটি প্রাচীনকাল থেকে রক্ষিত একটি সংস্কৃতি। প্রথম দিকের ম্যাপিলারা অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করেছিল এবং একই সাথে ইসলামে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত অতীতের রীতিনীতিগুলোও ত্যাগ করেছিলো। তারা ততক্ষন পর্যন্ত কেরালার সংস্কৃতিগুলো ত্যাগ কিংবা সংশোধন করেনি যতক্ষন না তারা নিশ্চিত হয়েছে এগুলো ইসলামে নিষিদ্ধ। স্থানীয় দ্রাবিড় জাতিগোষ্ঠী ও মোপলার মুসলমানদের মধ্য সম্পর্কের কারণে ‘আরবী মালায়ালাম নামের একটি ভাষার উদ্ভব ঘটায়। এই ভাষায় আরবি ও ফার্সি উভয় লিপিই রয়েছে। এই ভাষাটি এখনও বিদ্যমান এবং কেরালার অনেক ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এটি ব্যবহার হয়ে থাকে।
মরক্কোর ভ্রমণকারী এবং বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা যিনি মধ্যযুগে বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেছিলেন তিনি ১৩৪২ থেকে ১৩৪৭ সালের মধ্যে মালাবার উপকূল ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তার ভ্রমণকাহিনীগুলোতে মালাবারের মাপিলা মুসলমান সম্প্রদায়কে অত্যন্ত সম্মানিত সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইবনে বতুতা উল্লেখ করেছেন, মালাবার উপকূলে থাকা মাপিলা মুসলমানদের বাড়িতে মুসলিম জাহাজযাত্রীরা বিশ্রাম নিতেন এবং তাদের থেকে মসলাসহ পোশাক ক্রয় করতেন। তাদের পোশাকের কদর ছিলো আরবদের কাছে।

মালাবারে প্রবেশ করছে পর্তুগিজরা

ইউরোপীয় পর্তুগিজ ঔপনিবেশবাদীরা যখন ভারতের দক্ষিণ উপকূলে পৌছায় এবং এখানকার অধিবাসীদের উপর অত্যাচার নির্যাতন এবং তাদের ঔপনিবেশিক ঘাটি গাড়ে তখন তাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে এই মাপিলা সম্প্রদায়ের মুসলমানরাই। সে সময় মাপিলা মুসলিম পীর, সুফি-দরবেশ এবং আলেমরা পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিয়েছিলো। স্থানীয় অমুসলিমরাও পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সহযোগীতা করেছিলো। মালাবারে পর্তুগিজ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে এবং উৎসাহ দিতে সে ১৬তম শতাব্দীর বিখ্যাত শায়খ জয়নুদ্দিন মখদুম ‘তুহফাত আল মুজাহিদীন (শহীদদের বিজয়’ নামের একটি বই রচনা করেছিলেন। তিনি তার লেখা বইয়ে সে সময় পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে মাপিলা মুসলমানদের লড়াই, বিজয় এবং পতুর্গিজরা এ অঞ্চলে কিরুপ অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছিলো তার ইতিহাস ও বাস্তব প্রমাণ দিয়েছিলেন। মাপিলারা এতই বীর বিক্রমে লড়াই করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত পতুর্গিজ জলদস্যুরা এই মালাবার উপকুল থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

ভারতবর্ষের প্রথম নৌসেনাপতি কুঞ্জারি মারাক্কার। তিনিও এই মোপলা সম্প্রদায়েরই। যিনি পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন।


ম্যাপিলারাও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেও তীব্র বিদ্রোহ করেছিল। ১৯২১ সালে সংঘটিত এই বিদ্রোহ মালাবার বিদ্রোহ বা মোপলা বিদ্রোহ নামে ইতিহাসে পরিচিত। এই বিদ্রোহের কারণে ইতিহাসের নির্মম গণহত্যা চালিয়েছিলো ব্রিটিশরা।

ওয়াগন ট্রাজেডি।

ঐতিহাসিক গোলাম আহমদ মোর্তাজা মোপলা বিদ্রোহ এর বাহিনীদের লোমহর্ষক ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “এইবার বৃটিশ সরকার মালাবারে হাজার হাজার সৈন্য, নানা ধরণের ট্যঙ্ক, কামান, বোমা, কতকগুলো গানবোট এবং রণতরী নিয়ে আসে । তার আগে ইংরেজী কায়দায় অপপ্রচার হয়েই ছিল । সুতরাং হিন্দুরা বিপ্লবী মুসলমানদের তাদের শত্রু মনে করে লড়াইয়ে নেমে পড়েন। একদিকে ইংরেজ শক্তি তো আছেই, অন্য দিকে বাড়িতে পল্লীতে হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই এ লড়াই এক বিভৎস রুপ নিল। যুদ্ধ চলল এক মাস। তারপর একদিন ইংরেজরা আকাশ হতে গোলা বর্ষন, রণতরী হতে শেল বর্ষন, ট্যাঙ্ক ও কামান হতে গোলা বর্ষন করে মোপলাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ভস্মস্তুপে পরিণত করে। যুদ্ধ শেষে মোপলা বাহিনীর দশ হাজার পুরুষ-নারীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। আর জীবন্ত যাদের পাওয়া যায় তাদের বন্দী করে ‘বিচারের’ জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। বিচারের পূর্বেই অনেক পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে এবং নারীদের উপর লজ্জাকর পাপাচার করা হয়। বাকী বেঁচে থাকা আসামীদের বিচার-ফল এই দাঁড়াই – এক হাজার জনের ফাঁসী, দুই হাজার জনের দ্বীপান্তর সেই আন্দামানে শ্রমসহ নির্বাসন আর আট হাজার লোকের পাঁচ হতে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড । শাস্তির কি সুষম পরিবেশ।” (ঐ গ্রন্থ, পৃষ্ঠা-২৪৭/২৪৮)

তিনি আরও লিখেছেন,“এই অত্যাচারের ইতিহাসে আর একটি মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে। জীবন্ত বিপ্লবীদের মধ্যে যাঁরা শিক্ষিত ও নেতৃস্থানীয় ছিলেন তাঁদের মধ্যে বাছাই করা আশি জনকে ট্রেনের একটা ছোট্ট কামরায় দরজা জানালা বন্ধ করে কালিকটে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বন্দী বিপ্লবীরা জলের জন্য চিৎকার করেন এবং জলভিক্ষা চান। কিন্তু সে আর্তনাদে নিষ্ঠুরদের প্রাণ বিগলিত হয়নি। যখন ট্রেন কালিকটে পৌঁছালো তখন দেখা গেল অধিকাংশই শহীদ হয়েছেন। আরও দেখা গেল, একজন অপর জনের জিভ চুষে পিপাসা মেটাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই শুষ্ক রসনা ততটুকু রস দিতে পারেনি যা তাঁদের বাঁচাতে পারতো। যাইহোক, এতবড় একটা কাণ্ড ঘটবার পরও তখনকার ভারতীয় নেতারা সবাই যেন চেপে গেলেন ব্যাপারটা। মুসলমানদের মনে বেদনা সৃষ্টির অন্যতম একটা কারণ বলা যায়। খেলাফত কমিটির নেতা মাওলানা মহাম্মাদ আলী এটা নিয়ে হৈ চৈ করতে গিয়ে বাধা পেয়ে খুব আঘাত পান এবং কংগ্রেসের উপর আস্থা হারান । (ঐ গ্রন্থ, পৃষ্ঠা-২৪৮)

  • তথ্যসুত্র:
  • ihistory
  • wiki
2 মন্তব্য
0

Related Posts

2 মন্তব্য

Muhammed Aminul Islam August 9, 2021 - 5:05 pm

Thanks for nice muslim historical writing….

Reply
AB Azad August 13, 2021 - 6:27 pm

মোপলা মুসলিমদের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ,,

Reply

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!