মোপল বিদ্রোহ: ব্রিটিশ ও তাদের দালাল হিন্দু শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগঠিত এক সংগ্রাম

by sultan

লেখা শুরু আগেই বলে নেয়া ভালো, এই লেখা কোনো ধর্মকে উদ্দেশ্য করে নয়। এখানে ব্রিটিশ হিন্দু দালাল বলতে তৎকালীন হানাদার ব্রিটিশদের সাথে হাত মেলানো উচ্চবর্ণ নামধারী হিন্দু বিত্ত শ্রেণীর কথা বলা হয়েছে। তাই সাম্প্রদায়িক মনোভাব মনের ভেতর বার বার উকি মারলে এই আটিকেলটি স্কিপ করুন।

==মোপলা কারা==
মোপলারা সুদূর অতীতে আরব দেশ থেকে দক্ষিণ ভারতের মালাবার অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। তাদের জীবিকা ছিল প্রধানত কৃষিকাজ। স্থানীয় জমিদারদের কাছে বর্গাভিত্তিক চাষাবাদ করতো মোপলারা। ‘মােপলা’ মালাবারের একটা মুসলমান সম্প্রদায় বললেও ভালোভাবে চেনা যায়। মােপলাদের বড় দোষ অথবা গুণ হচ্ছে,তারা বরাবর ইংরেজ বিরােধী। তারা ছােট বড় অসংখ্য বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সৃষ্টি করেছে। তার মধ্যে পাঁচটি বিদ্রোহ ‘বিপ্লবে’র দাবিদার। সাতান্নর বিপ্লবের পরেও তাদের ওই বিদ্রোহগুলাে যথাক্রমে হয়েছিল ১৮৭৩, ১৮৫৫, ১৮৯৪, ১৮৯৬, ও ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে।

26th September 1925: Moplah prisoners go to trial at Calicut on the Malabar Coast in India’s south-western state of Kerala, charged with agitation against British Rule in India. (Photo by Topical Press Agency/Getty Images)

বিপ্লবীদের একশাে ভাগই ছিল মুসলমান। আর যেহেতু সেখানকার রাজা-মহারাজা – জমিদাররা বারেবারে ইংরেজদের হয়ে সাহায্য করে এসেছে, তাই বিপ্লবী মােপলা বাহিনীর সাথে হিন্দু বিত্তবানদেরও সংঘর্ষ শুরু হয়। উপেক্ষিত শােষিত অনুন্নত নিম্নশ্রেণীর অমুসলমানরা প্রতিবারেই মােপলাদের সঙ্গে যােগ দেবার ইচ্ছা করলেও নেতৃস্থানীয় ধনী মধ্যবিত্তদের কৌশলময় প্রচারে তাদের বােঝানাে সম্ভব হয়েছিল যে ওটা হিন্দু – মুসলমানের লড়াই। আর তাই অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যবহারের ফলে নীল বিদ্রোহের মতাে মিলিত হিন্দু – মুসলমান একত্রিত হতে পারেনি। অসহযােগ আন্দোলন এবং মাওলানা মুহাম্মদ আলীদের খেলাফত আন্দোলনেও ওই মােপলা বাহিনী রক্তাক্ত সাড়া দিতে ভােলেনি। ইংরেজ সরকার সারা ভারতে যা করেনি তা করেছে মােপলাদের মালাবারে। তারা সভা-সমিতি ও সম্মেলন করতে পারতেন না, কারণ কঠোর ভাবে তা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তাতেও বিপ্লবকে দমানাে যায়নি, বরং আগুনে পেট্রোল ঢালা হয়েছে। ফল হিসাবে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মােপলারা মালাবারকে স্বাধীন বলে ঘােষণা করেন এবং স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেন। সৈন্যদের সঙ্গে মুসলমান মােপলাদের ভয়াবহ সংগ্রাম শুরু হয়। একদিকে শােষক ও শাসক ইংরেজ ও তাদের ধামাধরা স্তাবকের দল, অন্য দিকে শাসিত শােষিত মৃত্যু পথযাত্রী বিপ্লবী দল। ইংরেজ সৈন্যদের হাত থেকে ওয়ালুভানাদ ও এরনাদ নামক দুটি স্থান ছিনিয়ে নেওয়া হলে যুদ্ধ আরও জোরদার হয়।

মোপলা সংগ্রাম মুসলিম নেতাগণ

তা ছাড়া, সেই সময় ওই এলাকার বাইরে চিঠিপত্র, টেলিগ্রাম ইত্যাদির যােগাযােগ বন্ধ রাখা হয়। আর বাইরে থেকে আসা প্রত্যেকটি চিঠি পরীক্ষা করে তবে বিলি করা হত। সামান্য ক্ষতির গন্ধ থাকলে তা নষ্ট করা হত। তবে সরকারি খবরাখবর আদান প্রদান অব্যাহত ছিল। মােপলা বাহিনী ইংরেজের সাহায্যকারী কিছু ভারতীয় নেতাদের ওই সময় হত্যা করে। চতুর ইংরেজরা মুসলমান কর্তৃক হিন্দু আক্রান্ত এই কথাটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে প্রচার করে সাফল্য লাভ করে।

ইংরেজের এ সমস্ত কুকীর্তি সরকারিভাবে গােপন রাখার চেষ্টা করা হলেও কিন্তু ভারতীয় নেতৃমহলে তা পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী মােপলা হত্যা এবং নকল সাম্প্রদায়িকতার খেলা বন্ধ করতে মালাবারে প্রবেশ করতে উদ্যত হলে উদ্ধত ইংরেজ তাদের মালাবারে ঢুকতে না দিয়ে ফিরিয়ে দেয় এবং জানিয়ে দেওয়া হয়,কাউকে এখন মালাবারে ঢুকতে না দেওয়ার আইন চালু রয়েছে। এইবার ব্রিটিশ সরকার মালাবারে হাজার হাজার সৈন্য, নানা ধরনের ট্যাঙ্ক, কামান,বােমা,কতকগুলাে গানবােট এবং রণতরী নিয়ে আসে। তার আগে ইংরেজি কায়দায় অপপ্রচার হয়েই ছিল। সুতরাং হিন্দুরা বিপ্লবী মুসলমানদের তাদের শত্রু মনে করে লড়াইয়ে নেমে পড়েন। একদিকে ইংরেজ শক্তি তাে আছেই, অন্য দিকে বাড়িতে,পল্লীতে হিন্দু-মুসলমান ভাই-ভাই – এ লড়াই এক বীভৎস রূপ নিল। যুদ্ধ চলল এক মাস। তারপর একদিন ইংরেজরা আকাশ থেকে বােমা বর্ষণ, রণতরী থেকে সেল বর্ষণ, ট্যাঙ্ক ও কামান থেকে গােলা বর্ষণ করে মােপলাদের ঘরবাড়ি,দোকানপাট,ভস্মস্তুপে পরিণত করে। যুদ্ধ শেষে মােপলা বাহিনীর দশ হাজার পুরুষ – নারীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। আর জীবন্ত যাদের পাওয়া যায় তাদের বন্দি করে বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। বিচারের আগেই অনেক পুরুষ ও শিশুকে হত্যা এবং নারীদের উপর লজ্জাকর পাপাচার করা হয়। বাকি বেঁচে থাকা আসামিদের মধ্যে এক হাজার জনের ফাঁসি,দু’হাজার লােকের আন্দামানে শ্রমসহ নির্বাসন আর আট হাজার জনকে পাঁচ থেকে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড।

শহীদ হওয়া ১০০ উচ্চশিক্ষিত মোপলাকে বের করে আনা হচ্ছে

এই অত্যাচারের ইতিহাসে আর একটি মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে। জীবন্ত বিপ্লবীদের মধ্যে যাঁরা শিক্ষিত ও নেতৃস্থানীয় ছিলেন তাদের মধ্যে বাছাই করা আশিজনকে ট্রেনের একটা ছােট্ট কামরায় দরজা জানালা বন্ধ করে কালিকটে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বন্দি বিপ্লবীরা জলের জন্য চিৎকার করেন এবং জলভিক্ষা চান। কিন্তু সে আর্তনাদে নিষ্ঠুরদের প্রাণ বিগলিত হয়নি। যখন ট্রেন কালিকটে পৌঁছাল তখন দেখা গেল অধিকাংশই শহিদ হয়েছেন। আরও দেখা গেল,একজন অপর জনের জিভ চুষে পিপাসা মেটাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই শুষ্ক রসনা ততটুকু রস দিতে পারেনি যা তাদের বাঁচাতে পারত। এতবড় একটা ঘটনার পরও তখনকার ভারতীয় নেতারা সবাই যেন চেপে গেলেন ব্যাপারটা। মুসলমানদের মনে বেদনা সৃষ্টির এটাও অন্যতম একটা কারণ বলা যায়। খেলাফত কমিটির নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী এটা নিয়ে আওয়াজ ওঠাতে গিয়ে বাধা পেয়ে খুব আঘাত পান এবং কংগ্রেসের উপর আস্থা হারান।

আরেকটি বিষয় এখানে না উল্লেখ করলেই নয়, তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশদের পা চাটা হিন্দু বিত্তবানরা সাধারণ হিন্দুদের খুব ভালোভাবেই বুঝিয়েছিলো যে, মোপলা মুসলমানদের বিদ্রোহ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নয় বরং হিন্দুদের বিরুদ্ধে। ফলে সাধারণ হিন্দুদের মনে মুসলিমবিদ্বেষ উস্কে ওঠে। এখনো বাংলাদেশের কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী মহল সহ ভারতের হিন্দুরাও এখনো মোপলাদের উপর মিথ্যা আরোপ লাগায় যে, মোপলারা নাকি হিন্দু গণহত্যা চালিয়েছে। যা ঘৃণ্য মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। এখানে মোপলারা যদি মুসলিম না হয়ে হিন্দু হত তাহলে তাদের ইতিহাস ভারতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকতো। আর এভাবেই ভারতে ব্রিটিশবিরোধী মুসলিমদের ইতিহাস চাপা পড়ে মিথ্যাচারের কালো কাপড়ে।

(সৌজন্য: চেপে রাখা ইতিহাস, লেখক: গোলাম আহমাদ মোর্তজা)

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!