সমুদ্রের বাদশাহ উসমানীয় নৌ সেনাপতি খায়রুদ্দিন খিজির বারবারোসা

by sultan

বিশ্বজুড়ে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে উসমানী সালতানাত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।  প্রায় ৮০০ বছর ধরে প্রবল প্রভাব ও প্রতাপের সাথে ইউরোপের প্রায় অধিকাংশ ভূখন্ড নিয়ে গঠিত উসমানী সালতানাতের ছিলো পানি ও স্থল উভয়স্থানেই প্রবল আধিপত্য।  বিশ্বজুড়ে মুসলিম শাসন বৃদ্ধিতে উসমানী সুলতান পাশে থেকে যারা অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলো খায়রুদ্দীন খিজির বারবারোসা।  পাশ্চাত্যে খায়রুদ্দীন খিজির পাশা অধিক পরিচিত বারবারোসা নামে। ইতালীয় শব্দ বারবারোসার অর্থ লাল দাড়িওয়ালা।  ১৪৭৮ সালে বর্তমান গ্রিসের অন্তর্গত লেসবস দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।  তার প্রকৃত নাম হলো খিজির। ওসমানী সুলতান ১ম সেলিম তার নাম দেন খায়রুদ্দীন।

যুদ্ধরত উসমানীয় নৌবাহিনী

ইতিহাস খ্যাত সুলতান সুলাইমান আল-কানুনীর সমকালীন ওসমানী নৌবাহিনীর প্রধান খায়রুদ্দীন খিজির বারবারোসার নেতৃত্বে ওসমানীরা আধিপত্য বিস্তার করেছিল তৎকালীন পৃথিবীর প্রধান প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে। তার নেতৃত্বেই বিশাল ভূমধ্যসাগর যুক্ত হয়েছিল ওসমানী সাম্রাজ্যের মানচিত্রে।  প্রথমত খায়রুদ্দীনের বড় ভাই উরুয রইস তৎকালীন ইউরোপীয় নাবিকদের কাছে পরিচিত ছিলেন বারবারোসা নামে। তার মৃত্যুর পর খায়রুদ্দীন খিজিরকেও একই নামে ডাকা শুরু করে ইউরোপীয় নাবিকরা।  চার ভাইয়ের মধ্যে সকলের ছোট খিজির প্রাথমিক জীবনে লেসবস, সেলেনাইকা এবং ইউবিয়ার মাঝে বাণিজ্য জাহাজ চালাতেন।

খায়রুদ্দিন বারবারোসা

পরবর্তীতে ওসমানী নৌবাহিনীতে কাজ করা বড় ভাই উরুয রইস রোডস দ্বীপের খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের হাতে বন্দী হলে ভাইকে উদ্ধারের জন্য তিনি ওসমানী নৌবাহিনীতে যোগ দেন। ক্রুসেডারদের থেকে মুক্ত হওয়ার পর উরুয ও খিজির একত্রে ভূমধ্যসাগরে খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ১৪৯২ সালে স্পেনে সর্বশেষ মুসলিম রাজ্য গ্রানাডার পতনের পর উরুয এবং খিজির স্পেনে কয়েকবার অভিযানে যান এবং সেখানকার হতভাগ্য মুসলমান ও ইহুদিদের উদ্ধার করে ওসমানী সালতানাতে নিয়ে আসেন।

১৫১৬ সালে স্পেনীয় নৌবাহিনীর নিকট থেকে তারা আলজেরিয়ার উপকূল মুক্ত করেন এবং আলজেরিয়াকে ওসমানী সালতানাতের অর্ন্তভুক্ত করেন। ওসমানী সুলতান ১ম সেলিম উরুয রইসকে আলজেরিয়ার গর্ভনর হিসেবে নিযুক্ত করেন।  ১৫১৮ সালে আলজেরিয়ার পশ্চিমে তিলমিসানে স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে এক অভিযানে উরুয রইস শাহাদাত বরণ করলে সুলতান সেলিম খিজির রইসকে আলজেরিয়ার গর্ভনর হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং তার উপাধি দেন খায়রুদ্দীন পাশা। আলজেরিয়ার গভর্নর হিসেবে খায়রুদ্দীন খিজির পাশা ওসমানী ভূমিকে স্পেনীয়, ফরাসী, ইতালীয়সহ ইউরোপীয় আগ্রাসী বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত রাখেন।

ইস্তানবুলে খায়রুদ্দিনের স্ট্যাচু

১৫৩৪ সালে ওসমানী সুলতান সুলাইমান আল-কানুনী খায়রুদ্দীন পাশাকে রাজধানী ইস্তানবুলে ডেকে পাঠান এবং তাকে ওসমানী নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। খায়রুদ্দীন পাশার নেতৃত্বে ওসমানী নৌবাহিনী সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তারের দিকে অগ্রসর হয়।  ১৫৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে বর্তমান গ্রিসের অর্ন্তগত প্রেভজার নিকটে এক নৌযুদ্ধে ইউরোপের সম্মিলিত নৌশক্তিকে পরাজিত করেন খায়রুদ্দীন পাশা। এর মধ্য দিয়ে সমগ্র ভূমধ্যসাগরের উপর ওসমানী নৌবাহিনীর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। খায়রুদ্দীন পাশার নেতৃত্বে সমুদ্রপথে ভারত ও মালয় দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং এ সকল সমুদ্রপথে সকল প্রকার জলদস্যুতার হাত থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।  ১৫৪৫ সালে খায়রুদ্দীন পাশা অবসর গ্রহণ করে ইস্তানবুলে বসবাস শুরু করেন। অবসরে তিনি তরুণ ওসমানী নাবিক ও নৌসেনাদের প্রশিক্ষণের জন্য নৌবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি নিজের নৌজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিকথা লিখেন। গাযায়াত-ই-খায়রুদ্দীন পাশা নামের পাঁচ খন্ডের এ স্মৃতিকথায় তার নৌজীবনের বিভিন্ন অভিযান ও যাত্রার বিবরণ দেন তিনি। ইস্তানবুলের তোপকাপি প্রাসাদ ও ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে এ স্মৃতিকথার মূল পান্ডুলিপি বর্তমানে সংরক্ষিত আছে।

১৫৪৬ সালের ৪ঠা জুলাই ইস্তানবুলে ৭৬ বছর বয়সে খায়রুদ্দীন পাশা ইন্তেকাল করেন।  বসফরাস সাগরের দিকে বন্দরের কাছাকাছি তাকে দাফন করা হয়।

0 মন্তব্য
1

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!