সম্রাট মুহিউদ্দিন আওরঙ্গজেব: খোদাভিরু এক সিপাহসালার ও মহান শাসক

by sultan

ভারতের দিল্লীতে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলমানদের উপর যে অবর্ননীয় নির্যাতন হলো একসময় সেই মুসলমানরাই সৎ ও নিষ্ঠার সাথে পুরো ভারতবর্ষ শাসন করে মুসলিমদের পাশাপাশি ভারতীয় স্থানীয় হিন্দুদেরও একটি সাবলীল জীবন উপহার দিয়েছিলো। যদিও ভারতের বর্তমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেটা স্বীকার করেন না। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি হলো ‘যেসকল মুসলিম শাসকরা বৈদেশিক বর্বর মোঙ্গল কিংবা উপজাতি আক্রমনকারীদের থেকে ভারতবর্ষকে রক্ষা করেছে এখন তাদেরকেই উল্টো বিদেশী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে’। সোজাসাপ্টা বলতে গেলে, ভারতীয় মুসলিম শাসকদের যদি ভারত অস্বীকার করে তাহলে হিন্দুস্থান বা ভারত বলতে কোনো দেশই থাকার কথা না। কারন এই আধুনিক হিন্দুস্থান ভারতীয় মুসলিম শাসকদের হাতে তৈরী।

ভারতে মুঘল শাসনামলের অধিকাংশ শাসকই ইতিহাসে মহান হিসেবে অমর হয়ে রয়েছেন। যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলেন ভারতবর্ষে মোঘল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবরের অধস্তন সম্রাট মহিউদ্দিন আওরঙ্গজেব বা বাদশাহ আলমগীর। ধর্মীয় দিক দিয়ে ইসলামের প্রচার প্রসার ও প্রতিপালনের দিক দিয়ে তিনি একদিকে যেমন ছিলেন র্শীষেদ অন্যদিকে একজন শাসক হিসেবে হিন্দু মুসলিম তথা জনসাধারনের কাছে তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ সম্রাট। একজন হানাফী-সুন্নী সম্রাট হিসেবে ইসলামে তার অবদান ও কীর্তি ছিল অতুলনীয়। যার কারনে পশ্চিমা ইসলামবিরোধী ঐতিহাসিকরা তাকে হিন্দু বিদ্বেষী, বর্বর ইত্যাদি হিসেবে আখ্যায়িত করেই ক্ষান্ত হয়নি পাশাপাশি তার অবদান ও কীর্তিগুলোও বিকৃত করে দিয়েছে। তার শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কেও নানা মিথ্যাচার করেছে।

ইসলামে অবদানে আওরঙ্গজেব:
সম্রাট আওরঙ্গজেব সিংহাসন লাভ করার সাথে সাথে শাসন পরিচালনা ও সরকারি নীতিমালাকে ইসলামী আঙ্গিকে রূপদান করেন। মুসলমানরা যাতে নিজেদের চরিত্র ও নৈতিকতাবোধ অটুট রাখে সেজন্য প্রধান শহরগুলোতে ‘মোহতাসেব’ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী নিযুক্ত করেন, যারা লোকদেরকে শরীয়ত অনুসরণে নিয়োজিত ছিলেন। মদ পান করা বা করানো, জুয়া খেলা এবং পতিতাবৃত্তির মতো অশ্লীল কার্যকলাপ ও মানবতাবিরোধী সকল প্রকার অপকর্ম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নির্মূল করে দেন। ইচ্ছাকৃতভাবে যারা পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত ছিলো তাদের তিনি দেশত্যাগের নির্দেশ দেন এবং যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়েছে তাদেরকে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে স্বাভাবিক জীবনধারাতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। ভাঙ নামক মাদক তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়, মুদ্রায় পবিত্র কলেমা তাইয়্যিবা খোদাই করা বন্ধ করেন যাতে অমুসলিমরা তার অমর্যাদা না করতে পারে, আকবর প্রবর্তিত ভ্রান্ত ধর্ম এলাহী বাতিলের পাশাপাশি এলাহী সনও বাতিল করেন এবং হিজরী সনের সূচনা করেন।
সম্রাট আওরঙ্গজেব মাজহাবের দিক থেকে হানাফী-সুন্নী ছিলেন। তাই তিনি বিশ^ বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থ ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’ হানাফী মাজহাব অনুসারী ইসলামী প-িতগণ তারই সরাসরি নেতৃত্বে রচনা ও সংকলন করেন। এর সংকলকদের মধ্যে প্রধান ছিলেন হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) এর মহান পিতা হজরত শাহ আবদুর রহীম (রহ.)। এটি ফতোয়া গ্রন্থ্য হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের অধিকারী এবং হানাফী মাজহাবের নির্ভরযোগ্য সনদ হিসেবে স্বীকৃত। এ বিশাল ফতোয়া গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার ফলে বিশেষতঃ উপমহাদেশের মুসলিম দেশগুলো সহ আরব বিশে^র আলেম সমাজে এর ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের এ অবিস্মরণীয় অক্ষয় কীর্তি ইসলামী ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল স্মারক।

একজন মুসলিম হিসেবে আওরঙ্গজেব:
সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক ও মহান সেনাপতি। তিনি অপরিসীম পরিশ্রম করার পরও ২৪ ঘন্টার মধ্যে মাত্র ৩ ঘন্টা ঘুমাতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অতি উচুঁ স্তরের। সিংহাসনে আরোহন করার পর নানা কর্ম তৎপরতায় ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীম কণ্ঠস্থ করে ফেলেন। তিনি মৌলিকভাবে একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন। শাসক হিসেবে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের পদাংক অনুসরণ করে চলার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের ব্যাপক অগ্রগতির কামনা করতেন।
তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ নকল এবং টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাষ্ট্র ও জাতির রাজকোষ থেকে নিজের জন্য এক কানাকড়িও গ্রহণ করা বৈধ মনে করতেন না। তিনি আপন প্রজা সাধারণের হাল হাকিকত সম্পর্কে পরিপূর্ণরূপে অবগত থাকতেন। তিনি তাঁর বাদশাহীকে আল্লাহ পাকের পবিত্র অবদান এবং সরকারী কোষাগারকে আমানত মনে করতেন। ঐতিহাসিক লেনপুল লিখেছে, ‘আওরঙ্গজেব ছিলেন ইনসাফ ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক। তাঁর পঞ্চাশ বছরের শাসনকালে তাঁর কাছ থেকে জুলুম ও বেইনসাফের কোন একটি কাজও প্রকাশ পায়নি।’ তিনি নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে কখনও ত্রুটি করেননি। যাবতীয় ইবাদত বন্দেগীর প্রতি তিনি সম্মান প্রদর্শন করতেন। এতো বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচুঁস্তরের মুত্তাকী ও খোদাভীরু ব্যক্তি। ফরয নামায ছাড়াও তিনি নফল ইবাদত করতেন। রমযানের ফরয রোযা ছাড়াও নফল রোযা রাখতেন। কমপক্ষে প্রতি সপ্তাহে তিনটি রোযা অবশ্যই রাখতেন। আওরঙ্গজেবের খোদাভীরুতা এবং দূরদর্শিতার কারণে তিনি সাধারণ গণমানুষের কাছে ‘জিন্দা পীর’ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

তিনি কি হিন্দু নির্যাতনকারী ছিলেন:
সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ এই যে, তিনি তাঁর হিন্দু প্রজাদের প্রতি উৎপীড়ন চালিয়েছেন, তাদেরকে তাদের চাকরি হতে বহিষ্কার করেছেন, তাদের মন্দিরগুলো ধ্বংস করেছেন, তাদের স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন, এমনকি সর্ব প্রকারে তাদের জীবন অতিষ্ট করে তুলেছেন। অথচ ইতিহাসে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়না। আওরঙ্গজেব আলমগীর ছিলেন তাঁর পূর্বসুরীদের চেয়ে ব্যতিক্রম। প্রফেসর শ্রী রাম শর্মার ভাষ্য অনুযায়ী, যখন আওরঙ্গজেব সিংহাসন লাভ করেন তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় বিশ^াসী মুসলমান এবং এ বিশে^ আল্লাহর শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে চাইতেন। একজন মুসলমান বাদশাহ হওয়ার কারণে এই বিষয়টি তার কাছে অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত মনে হয়েছে যে, দেশে কোরআন ও সুন্নাহর বিধিবিধান প্রবর্তিত না হওয়া। প্রয়োজন হচ্ছে আমরা আওরঙ্গজেবের প্রত্যেক কাজকে বর্ণিত বাস্তবতার আলোকে দেখব।’
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তিনি নাকি হিন্দু কর্মচারীদের চাকুরী হতে বহিষ্কার করেছেন। এর জবাবে প্রফেসর শর্মা কর্তৃক সংগৃহীত পরিসংখ্যানটি উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে। এ পরিসংখ্যান ‘মোগল সম্রাটগণের ধর্মীয় কর্ম কৌশল’ নামক গ্রন্থ হতে নেওয়া হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে-আকবরের শাসনামলে ‘এক হাজারী’ ও এর চেয়ে ওপরের মোট ১৩৭টি মুনসেবদার পদ ছিল, যেগুলোর মধ্যে ১৪ জন ছিলেন হিন্দু। জাহাঙ্গীরের সময়ে ‘তিন হাজারী’ এবং তার উপরের সর্বমোট ৪৭টি মুনসেবদারের মধ্যে ৬ জন হিন্দু ছিলেন। শাহজাহানী আমলে ‘এক হাজারী’ ও এর উপরের মোট ২৪১টি মুনসেবদারের মধ্যে ৫১ জন ছিলেন হিন্দু। শাহজাহানের যুগে ছোট বড় সর্ব মোট ৮ হাজার মুনসেবদার ছিলেন। আওরঙ্গজেব আলমগীরের সময়ে তাদের সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজার ৫ শত ৫৬ (১৪,৫৫৬) হয়ে যায়, তাদের মধ্যে ১৪৮ জন ছিলেন হিন্দু। এ থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আওরঙ্গজেব এর শাসনামলে উল্টো হিন্দু প্রজারাই মুসলমানদের মতো স্বাবলম্বী ও ধনিক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিলো। (জমিল ইউসুফকৃত বাবর থেকে যাফর, মোগল সম্রাটগণের ধর্মীয় কর্ম কৌশল)
তার বিরুদ্ধে আরেকটি মিথ্যাচার হলো, তিনি নাকি হিন্দুদের জোরপূর্বক মুসলমান বানিয়েছেন। এ প্রধান অভিযোগ সম্পর্কে মাওলানা জুকাউল্লাহ তার বিখ্যাত গ্রন্থে লিখেছেন, আওরঙ্গজেব আলমগীর তার শাসনামলে একজন হিন্দুকেও জোরপূর্বক মুসলমান করেননি, কিন্তু তার যুগের প্রভাবই এমন ছিল যে, রাজধানী ও উহার আশে পাশের হিন্দুরা দ্বীন ইসলামের ইনসাফে আকৃষ্ট হয়ে মুসলমান হয়ে যাচ্ছিল। যে হিন্দু নিজ ইচ্ছায় মুসলমান হয়ে যেত, তাকে শরীয়া বিভাগের পরিচালক সম্রাটের দরবারে নিয়ে যেতেন এবং কলেমা তাইয়্যিবা পড়াতেন। সম্রাট তাকে ‘খেলাত’ (রাজকীয় পোশাক) তার, নগদ অর্থ এবং অবস্থা অনুাযায়ী দান করতেন। যে সব বিশিষ্ট হিন্দু মুসলমান হতো তারা সরাসরি স¤্রাটের নিকট উপস্থিত হতো এবং সম্রাট স্বয়ং তাঁর মুখে কলেমা পড়াতেন, সেই সাথে রাজকীয় পোশাক পুরস্কার প্রদানে ধন্য করতেন। অমুসলিম ইউরোপিয়ান নিরপেক্ষ লেখকগণও স্বীকার করেছেন যে, আওরঙ্গজেব ধর্মীয় ব্যাপারে হিন্দু প্রজাদের ওপর কোনো প্রকারের বাড়াবাড়ি করেননি এবং তাঁর রাজত্বকালে জোরপূর্বক কোনো হিন্দুকে মুসলমান করার উল্লেখ সে সময়কার কোনো ইতিহাস পুস্তকে নেই। এরূপ মন্তব্য এক ইংরেজ ঐতিহাসিকও করেছেন। তিনি ‘তারিখে ফেরেশতা’র বরাতে লিখেছেন, ‘দ্বীনের উন্নয়নের জোশে আওরঙ্গজেব নও মুসলিমদের সাথে মুক্ত হস্তে নিশ্চয় বদান্যতা প্রদর্শন করেছেন। তিনি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর ধর্মীয় ব্যাপারে কঠোরতা প্রদর্শন করেননি।

জিজিয়া নিয়ে মিথ্যাচার:
আওরঙ্গজেব আলমগীরের যে পদক্ষেপটি হিন্দুদের কাছে খুবই মন্দ মনে হয়েছে তা হলো ১৬৯৭ সালে তার দ্বিতীয়বার ‘জিজিয়া’ আরোপ করা। আওরঙ্গজেব আলমগীর সিংহাসনে আরোহন করার পর ছোট বড় আশি প্রকারের ট্যাক্স মাফ করে দেন। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ হিন্দুদেরই পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু হিন্দু ইসলামবিদ্বেষী ঐতিহাসিকরা ইচ্ছে করেই মাফ করে দেয়া ৮০ প্রকারের ট্যাক্সের বিষয়টি লুকিয়ে জিজিয়া করের বিষয়টিই বেশি আলোকপাত করেছে। আর জিজিয়া করও ছিলো নিত্যান্তই নামমাত্র। হিন্দুরা এ ট্যাক্সের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কিন্তু আওরঙ্গজেব তার সিদ্ধান্তে অটল-অবিচল থাকেন।

সবমিলিয়ে ভারতবর্ষের যদি মহান ইসলামী শাসকদের তালিকা তৈরী করা যায় তাহলে নিঃসন্দেহে এবং ইতিহাসের আলোকে সম্রাট মহিউদ্দিন আওরঙ্গজেব আলমগীরকেই প্রথমে রাখতে হবে। হতাশার বিষয় হলো, মুসলমানরা আজকে ইসলামের এই সকল মহান মুসলিম শাসকদের সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য পেয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে। অথচ তাদের জিন্দেগী ছিলো ইসলামী নুরে ঝলমল।

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!