সুলতান আলপ আরসালান: গর্জে ওঠা এক সেলজুক সিংহ

by sultan

১০৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সেলজুক সালতানাদের মহান স্থপতি প্রথম স্বাধীন সুলতান তুগরুল বে বুয়িদ সাম্রাজ্যের শিয়াদের পরাজিত করে বাগদাদ পুনরায় খলিফা কাইম বি-আমরিল্লাহর হাতে সপে দেন। এর কিছুদিন পরই এই মহান মুসলিম সুলতান মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। তার মৃত্যুর পর সেলজুক সালতানাদের সুলতান কে হবে তা নিয়ে বিশাল এক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। মরহুম সুলতানের এক পালক পুত্র ছিলো যার নাম সুলায়মান। এই সুলায়মান ছিলেন তুগরুল বের আপন ভাই চেগরির সন্তান। নিজের সন্তান না থাকায় ভাইয়ের সন্তানকেই নিজের কাছে রেখে শাহজাদাদের মতো করে মানুষ করেছিলেন।  সুলতান ইন্তেকাল করার আগে তার প্রধানমন্ত্রী আমিদুল মালিক কুন্দুরীর কাছে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর যাতে তার ভাইয়ের ছেলে সুলায়মানকেই সুলতান বানানো হয়।  কিন্তু এতে বেশ কয়েকটি বাধা ছিলো।  কারণ মরহুম সুলতানের চাচাতো ভাই কুলতামিশ ও সুলতানের আরেক ভাতিজা আলপ আরসালানও সেলজুক সালতানাতের এই কঠিন মুহুর্তে হাল ধরতে চান।  সুলতানের সিংহাসন অলঙ্কিত করতে চান। 

অবশেষে প্রধানমন্ত্রী কুন্দুরী সব বাধা চেপে গিয়ে সুলতানের অসিয়ত অনুযায়ীই সুলায়মানকেই সুলতান হিসেবে অভিষেক করান এবং খোরাসানের দায়িত্বে থাকা আলপ আরসালানকে কঠিন হুশিয়ারী দিয়ে একখানা চিঠি লিখেন।  চিঠিতে তিনি জানান ‘ আরসালান যাতে কোনোভাবেই নতুন সুলতানবিরোধী কোনো কর্মকান্ডে লিপ্ত না হয়। ” এই চিঠির পাঠানোর কিছুদিন পরই কুন্দুরী খবর পেলেন যে, খোরাসান থেকে বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে আলপ আরসালান সেলজুক সালতানাদের রাজধানী রায় নগরীর উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে এবং তার লক্ষ্য সিংহাসন উদ্ধার করা।  এই খবর শুনে নব্য সুলতান সুলায়মান ও প্রধানমন্ত্রী দুইজনই রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।  সেই সেই সময় আবার খবর এলো যে, মরহুম সুলতানের চাচাতো ভাই কুলতামিশও রাজধানী দখল করতে তার সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছে।

পরিচয়:

আলপ আরসালানের আসল নাম হলো মুহম্মদ।  আলপ আরসালান অর্থ হলো সিংহযোদ্ধা।  এই মহান যোদ্ধার জন্ম ১০২৯ সালের ২০ জানুয়ারী।  সম্পর্কে তিনি সেলজুক সালতানাদের প্রথম স্বাধীন সুলতান তুগরুল বের ভাতিজা অর্থাৎ তুগরুল বের ভাই চেগরির সন্তান।  প্রাথমিক জীবনে তিনি তার চাচা তুগরুল বেগের সাথে ফাতেমী শিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।  পরবর্তীতে ১০৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তার বাবা চেগরির ইন্তেকাল হলে তিনি খোরাসানের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন।

দামঘানের যুদ্ধে বিজয় ও ক্ষমতা উদ্ধার:
আলপ আরসালান রাজধানী রায় নগরীতে পৌছানোর আগেই কুলতামিশ তার সৈন্য নিয়ে সেলজুক রাজবাহিনীকে হারিয়ে সিংহাসন দখল করে নেয়।  এরপর দামঘান নাম প্রান্তরে উপস্থিত হন আরসালানকে থামিয়ে দেয়ার জন্য।  কিন্তু কুলতামিশের সেনারা আরসালানের শক্তিশালী সেলজুক বাহিনী দেখে পালাতে শুরু করে।  গুটিকয়েক সৈন্য ব্যতিত কুলতামিশের অধিকাংশ সেনাই পালিয়ে যায়।  এরপর কুলতামিশ গুটিকয়েক সেনা নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে শেষমেষ আরসালানের হাতে পরাজিত হয়।  এরপর রাজধানী রায় দখল করে ১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল সেলজুক সালতানানাতের নতুন সুলতান হন আলপ আরসালান।  এরপর ক্ষমতায় এসে তিনি প্রধানমন্ত্রী কুন্দুরিকে মৃত্যুদন্ড দেন এবং বিখ্যাত ইবনে আলী আত তুসিকে সালতানাতের প্রধানমন্ত্রী ও নিজামুল মূলক হিসেবে নিয়োগ করেন।  নিজামুল মূলক অর্থ সালতানাতের ব্যবস্থাপক।  এই ইবনে আলী আত তুসিই হচ্ছেন সেই বিখ্যাত নিজামুল মূলক তুসি।  যিনি তার মহান কর্মের জন্য ইতিহাসের অমর হয়ে রয়েছেন।

সেলজুলকদের সুলতান হওয়ার পরই আরসালান আব্বাসী খলিয়ার কাছ থেকে ক্রমাগত বাগদাদ ছাড়ার জন্য চাপ পেতে থাকেন।  আব্বাসীয় খলিফা আরসালানের প্রতাপকে বিপদজ্জনক ভাবা শুরু করলেন।  যদিও তখন আব্বাসীয় খলীফার তেমন কোনো শক্তি ছিলোনা।  শক্তি না থাকায় আব্বাসীয় খলিফা অন্য অঞ্চলের সুলতানদেরকে আরসালানের বিরুদ্ধে আক্রমনের জন্য উস্কানি দিতে থাকেন।  কিন্তু সুলতান আরপ আরসালানের সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী সেনাবাহিনীর ভয়ে তারা এ আক্রমন করতে সাহস পায়নি।  আরসালান খলীফাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য মরহুম সুলতান তুগরুল বেগের স্ত্রী যিনি আব্বাসীয় খলীফার মেয়ে ছিলেন তাকে বাগদাদে পাঠিয়ে দেন।  এতে করে বেশম ভয় পেয়ে যান খলিফা এবং আরসালানকে সুলতান ও তার সাম্রাজ্যকে সালতানাত হিসেবে স্বীকার করে নেন।

কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন:
আলপ আরসালান সুলতান হওয়ার পরই সালতানাতের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ দানা বাঁধতে থাকে।  তাই তিনি প্রথমে এইসব বিদ্রোহ দমনের সিদ্ধান্ত নেন।  বিদ্রোহ দমনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি জর্জিয়া দখল করার পরিকল্পনা করেন।  কিন্তু জর্জিয়া দখল করতে তাকে ব্যাপক বেগ পেতে হয়। সুলতান এক ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে যান।  সুলতানের বীরত্বের কাছে হার মানে জর্জিয়া।  জর্জিয়ার বাগারাত ৪র্থ সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করেন।  এরপর সুলতান কারস দখল করে সেখানে দ্বীন ইসলামের প্রচার করেন।  পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে তিনি এগিয়ে যান এনি রাজ্যের দিকে।  এই শহর দখল করতে তিনি শহরের প্রাচীরের বাইরে থেকে উত্তপ্ত তেলের বোমা নিক্ষেপ করেন।  ফলে শহরের লোকজন ভীত হয়ে সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করেন।  সুলতানের এই বিদ্রোহ দমনের মধ্যেই সেলজুক সালতানাতের কিরামান, সোগানিয়া ও হাউতেল্লান নামক প্রদেশগুলো বিদ্রোহ করে বসে।  অগত্যা সুলতান সেদিকে গিয়েও আবার সেই প্রদেশগুলোতে বিদ্রোহ দমন করে নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসেন।  এরপর ধারাবাহিকভাবে সুলতান আরপ আরসালান গুরগেন্স, মেঙ্গিস্লাক শহরগুলোকেও নিজের সালতানাতের আওতায় নিয়ে আসেন।

১০৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ভলগা আলফ থেকে খাওয়ারিজমের কিছু অঞ্চলও তিনি নিয়ন্ত্রনে নেন এবং সেখানে সুযোগ পুত্র মালিক শাহকে নিয়োগ করে তিনি জেন্দের দিকে এগিয়ে যান।  জিন্দের দিকে এগিয়েই তিনি খান ইব্রাহিম থেকে মাভেরানের কিছু অংশ বিজয় করেন এবং নিজের সালতানাতের সাথে যুক্ত করেন।  পরে তার বীর সেনাপতি গোমস্তগিন এডেসা আক্রমন করে তা দখল নেন এবং সেখানকার শাসককে বন্দী করলে ২০ হাজার দিনারের বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেয়া হয়।

আলপ আরসালান যখন সেলজুকদের শক্তি সামর্থ্যের পরিচয় দিয়ে নিজের রাজ্যের বিদ্রোহ দমাতে ব্যস্ত, তখন পশ্চিম রোমান সম্রাজ্যে রাজা কন্সটান্টিন ১০ম মাত্র মারা গিয়েছে। এটা ১০৬৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকের ঘটনা। রোমান সাম্রাজ্যের ভার পড়েছে কন্সটান্টিনের বিধবা স্ত্রী ইউডোকিয়া-র উপর। ইউডোকিয়াকে বিয়ে করে ১০৬৮ খ্রিষ্টাব্দে রাণীসমেত রাজ্য লাভ করেন রোমানোস ৪র্থ। তার ক্ষমতা লাভে কিছুটা হলেও রেগে যান জর্জিয়ার প্রয়াত শাসক ডুকাসের ছেলে এন্ড্রুনিকাস ডুকাস। কিন্তু এন্ড্রুনিকাস নিজেকে সংযত করে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। অন্যদিকে সেলজুকরা তখন মিশরি ফাতেমি সাম্রাজ্যের শিয়াদের সাথে লেভান্টে যুদ্ধরত। রাজা হয়েই রোমানোস এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চান। তিনি সেলজুকদের আজীবনের জন্য চুপ করিয়ে দিতে ইরান, খোরাসান, ইরাক, সিরিয়া দখল করতে উদ্যত হন। এই উপলক্ষে মার্চ ১০৬৮তে প্রায় ২০০০০০ সৈন্য নিয়ে নিয়ে তিনি কায়সেরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এদিকে অগ্রসর হয়েই তিনি খবর পান, সেলজুকরা তার সম্রাজ্যের নিউকায়সারিয়া দখল করে নিয়েছে। তিনি তাই আবার উত্তর দিকে নিজের মোড় ঘুরান এবং তেফ্রিকে গিয়ে তার আরেক বাহিনীর সাথে মিলিত হন।

এবার তিনি তার সেনাপতি ম্যানুয়াল কমিনসকে সেলজুকদের মুখোমুখি যুদ্ধে পাঠান। ম্যানুয়াল সেলজুকদের সাথে প্রথম মুখোমুখি হন তেফ্রিকে। যুদ্ধে রোমান বাহিনী জয়লাভ করেন। ফলে তারা সিরিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে মানবিজ শহর দখল করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং গণহত্যা চালায়। এই খবর আলপ আরসালানের কাছে গিয়ে পৌঁছায়। তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে এগিয়ে আসেন। ইকুনিয়ামের কাছে কোনো এক স্থানে সেলজুকরা রোমানদের লজ্জাজনকভাবে পরাজিত করেন। ম্যানুয়াল কমেনস ধরা পড়ে। কিন্তু দয়ালু সুলতান তার সাথে শান্তিচুক্তি করে তাকে মুক্তি দিয়ে দেন।

মানজিকার্টের যুদ্ধ :
১০৭১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রোমানোস তার শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে পুনরায় সেলজুক সাম্রাজ্যের উপর চড়াও হয়। রোমানোস প্রথমত তার কিছু গুপ্তচরকে নবায়ন করার কথা বলে সেলজুকদের রাজধানীতে পাঠায়। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেলজুকদের সামরিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা। আলপ আরসালান তখন ফাতেমিদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত। রোমানিয়াস প্রায় ১০০০০০ মতান্তরে তার চেয়ে বেশি সৈন্য নিয়ে সিরিয়ার দিকে এগিয়ে আসেন। রোমানিয়াসের সেনাপতিরা তাকে দ্রুত অগ্রসর হতে বাঁধা দেন। কিন্তু রোমানিয়াস তাদের বাধাকে অগ্রাহ্য করে মানজিকার্টে গিয়ে তাবু ফেলেন এবং তার সৈন্যবাহিনীকে দুইভাগে বিভক্ত করেন। তার অগ্রসরের কথা শুনে আলপ আরসালান তার রাজধানীতে ফিরে আসেন। এখানে তার সাথে যোগ দেয় তার পুত্র মালিক শাহর অধীনে থাকা ১০০০০ সৈন্য। প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য নিয়ে আলপ আরসালান রোমানোস কে বাঁধা দিতে এগিয়ে চলেন। এদিকে রোমানোস তার বাহিনীকে দুইভাগে ভাগ করে ৩০০০০ সৈন্যের একটি দল পাঠিয়ে দেন ল্যাক ভ্যানের পশ্চিমে। কারণ তার ধারণা ছিল—সুলতান আলপ আরসালান এদিক দিয়ে আক্রমণ করবে। কিন্তু সুলতান যে কী চিজ ছিলেন, তা বোঝার সাধ্য আসলেই বেচারার ছিল না। সুলতান ল্যাক ভ্যানের পশ্চিম পাশে না গিয়ে আপেক্ষিক খারাপ রাস্তা ধরে পূর্ব দিক দিয়ে চলে যান এবং বহু চড়াই-উৎরাই ডিঙিয়ে ল্যাক ভ্যান পার হয়ে রোমানোসের অপেক্ষাকৃত বাহিনীকে আক্রমণ করেন। এই ফাঁকে আরসালানের গুপ্তচরেরা বিপক্ষ বাহিনীর মাঝে এই গুজব ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন যে, রোমানোস মারা গেছেন এবং তার বাহিনী হেরে গেছে। এ কথা শুনে ৩০০০০ সৈন্যের বাহিনীটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়। ফলে রোমানোসের ৭০০০০(মতান্তরে ৫০০০০) সৈন্যের নিজের বাহিনী ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। এবার আরসালান তার বাহিনী নিয়ে মানজিকার্টে পৌঁছান। অনেক ঐতিহাসিকের মতে—সেখানে গিয়ে তিনি সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু অহংকারে অন্ধ রোমানোস কোনোভাবেই সন্ধিপ্রস্তাব মেনে নিলেন না; বরং যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। পরদিন ২৬ আগস্ট ১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধ শুরু হলো। সেলজুক সুলতান আরসালান সকালে সাদা কাপড় পড়ে নামাজ পড়ে ময়দানে আসেন এবং তার জিহাদি ভাষণ দিয়ে তার যোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করেন। আরসালান এই যুদ্ধে মৃত্যুপণ নিয়ে কাফনের কাপড় পরেই নেমেছিল। মানজিকার্ট রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। রোমানোসের বাহিনীতে ছিল রোমানরা, কিছু তুর্কি যোদ্ধা, সেমি নমাডিক যোদ্ধা জাতি এবং নরমানরা।

রোমানোস তার বাহিনীকে চার ভাগে বিভক্ত করলেন। রাইট ফ্ল্যাংকের দায়িত্বে ছিল রাসেল-ডি-বাইল্লুল, লেফট ফ্ল্যাংক ব্রায়েন্নিয়াস ,মাঝখানে ইনফ্যান্ট্রিতে সম্রাট নিজে এবং ডিইক অফ এন্টিয়ক আর পেছনে রিজার্ভ বাহিনীর জন্য এন্ড্রুনিকাস ডুকাস। রোমানোস প্রথমে নিজে আক্রমণ না করে তার এক সেনাপতি বাসিলাস-কে পাঠান। সেলজুকরা তাকে পরাজিত করেন। এবার রোমানোস তার পাখির ডানার শেইপের বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু সেলজুকরা চালাকি করে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে বরং Heat and Run টেকটিকে পেছনে জায়গা দিয়ে সরে যান। ফলে রোমানোসের বাহিনী তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। রাইট উইং এর ক্যাভিলারি, ল্যাফট উইং-এর ক্যাভিলারি আর সেন্ট্রাল ইনফ্যান্ট্রি। রিজার্ভ বাহিনী তখনও যুদ্ধে অংশ নেয়নি। এভাবেই রোমানোস সেলজুকদের পিছু হটাতে হটাতে তাদের তাবু পর্যন্ত নিয়ে আসেন। এদিকে ক্রমশ সন্ধ্যা হয়ে আসে এবং রোমানোস তার বাহিনীকে তাবুতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিন বাহিনী আলাদা আলাদা থাকাতে রোমানোসের কথায় একপ্রকার গোলযোগ সৃষ্টি হয়। রাইট উইং সম্রাটের কথা না শুনতে পেয়ে যুদ্ধ চালাতে থাকে। এই সুযোগে সেলজুকদের সেন্ট্রাল আরচারি বাহিনী গিয়ে ঘিরে ফেলে রোমানোসের রাইট উইং-কে। রোমানোস খবর পেয়ে সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার আগেই রাইট উইং-কে পাইকারি হারে যমালয়ে পাঠিয়ে দেয় সেলজুকরা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে রোমানোস পরাজিত হয়েছেন। ফলে ল্যাফট উইং ময়দান ছেড়ে পালায়। এন্ড্রুনিকাস এবার তার পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই সুযোগে ময়দান ছেড়ে চলে যায় তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে। ফলে রোমানোসকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে সেলজুক বাহিনী এবং বন্দী করে।  পরবর্তীতে মহানুভব সুলতান তাকে মুক্তি দেন।

সুলতান রোমানোসকে ক্ষমা করে দিয়ে তার কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য তুলে ধরেন। এবং কয়েকটা শর্তে শান্তি চুক্তি করেন।  শর্তগুলো এমন ছিল—

১. এন্টিয়ক, এডেসা, হিরাপোলিস, মানজিকার্ট রাজ্যগুলো সুলতানের জন্য ছেড়ে দিতে হবে।

২. একধারে ১.৫ মিলিয়ন স্বর্ণ মুদ্রা এবং বাৎসরিক ৩ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা সুলতানকে নজরানা হিসেবে পাঠাতে হবে।

৩. সুলতানের ছেলে এবং রোমানোসের মেয়ের বিয়ে হবে।

মানজিকার্টের যুদ্ধ শুধু আনাতোলিয়াই নয় বরং পরবর্তী সময়ের উসমানি সাম্রাজ্যের জন্যও একটি অন্যতম গুরত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এর মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে এবং আনাতোলিয়ার প্রবেশ দ্বার মুসলিম তুর্কিদের জন্য খুলে যায় আজীবনের জন্য। তুর্কিরা এখানে তাদের জায়গা পাকাপোক্ত করে নেয়। বলা হয়—আলপ আরসালান এই যুদ্ধে নিজের বাহিনীকে শত্রু বাহিনী থেকে আলাদা করতে তার ঘোড়াগুলোর লেজ গুটিয়ে বেঁধে দেন।

১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে ১৫ ডিসেম্বর ইসলামের এই মহান বীর ইহকালের মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। মার্ভ শহরে তাকে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুর পর মসনদে বসেন তার সুযোগ্য পুত্র মালিক শাহ সেলজুকি। পশ্চিমারা যাকে দ্যা গ্রেট উপাধিতে স্মরণ করে। যার শাসনামলে সেলজুক সাম্রাজ্য তার বিস্তৃতি ও উন্নতির সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়।

0 মন্তব্য
3

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!