হালিল হালিদ বে: উসমানীয় এক বুদ্ধিজীবির উপাখ্যান

by sultan

উসমানীয় সালতানাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ৮০০ বছরের ইতিহাসে অসংখ্য বীর সুলতান, সিপাহসালার, সেনাধিনায়ক, প্রকৌশলীর নাম ইতিহাসে বার বার স্বরণ করা হয়েছে। স্বরণ করা হয়েছে তাদের বীরত্বগাধা ও ইসলাম-মুসলমানদের প্রতি তাদের অগাধ ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগ। তাদেরই মধ্যে একজন হালিল হালিদ বে (বাংলায় হবে খলীল খালিদ)। তুরস্কের টিআরটি মিডিয়ায় প্রচারিত সুলতান আব্দুল হামিদ সিরিজে হালিল হালিদ বে চরিত্রকে বেশ আকর্ষনীয় করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু তাও অনেক সামান্য। যার কারণে মুসলিমদের ইতিহাস পিপাসু প্রজন্ম আমাদের কাছে বার বার হালিল হালিদ বে’র পুর্নাঙ্গ ইতিহাস জানতে চেয়েছে। তবে তার পুর্নাঙ্গ ইতিহাস না পাওয়া গেলেও যেটুকু তুর্কি ইতিহাসে প্রকাশ করা হয়েছে সেটুকুই জেনে আসা যাক

হালিল হালিদ তুরস্কে যতটা না সুপরিচিত না তার চেয়ে বেশি তার নাম শোনা যায় উত্তর আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যে। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াও তিনি ইসলামী বিশ্বে তার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও রিসার্চের জন্য পরিচিত। এককথায় হালিল হালিদ বে ছিলেন একজন উসমানীয় বুদ্ধিজীবি। হালিল হালিদ বে ছিলেন ইংল্যান্ডের ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা প্রথম উসমানীয় শিক্ষক। ইংল্যান্ডে প্রভাষক থাকাকালীন তিনি উসমানীয় সালতানাতের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের গোপন ষড়যন্ত্র ও পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা ও বিরোধীতা করেছিলেন। তৎকালীন মুসলিম প্রজন্মকে তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উসমানীয় খিলাফত ধ্বংসের উচ্চাকাঙ্খার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন পুস্তক ও আর্টিকেলের মাধ্যমে বার বার চেষ্টা করেছেন যেন ইসলামী সমাজব্যবস্থায় পশ্চিমা অপসংস্কৃতি অনুপ্রবেশ না করতে পারে এবং ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি থেকে মুসলিম সমাজ দুরে সরে না যায়। তিনি জাতীয়তাবাদকে মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি সবসময় চেয়েছিলেন যেন মুসলমানরা দেশ-গোত্র বিভেদ বাদ দিয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। মুসলিম ‍যুবসমাজকে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, উসমানীয় খিলাফতকে যেকোনো মূল্যেই রক্ষা করতে হবে। কারণ ব্রিটিশ আধিপত্যবাদীদের আগ্রাসন থেকে বাচতে একমাত্র ভরসাস্থল হলো খিলাফত এবং তুর্কি-কুর্দি-আরব-সার্কাসিয়ান-বসনিয়ান-আলবেনিয়ান-আজমি সব এক ছাতার নীচে এসে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

হালিল হালিদ বে ১৮৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবার নাম ছিলো আহমেদ রাফি এফেন্দী এবং তার মায়ের নাম ছিলো রফিকা সিদ্দীকা হানাম।   তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তার পরিবার এশিয়া থেকে বর্তমান আঙ্কারায় এসে বসবাস শুরু করেছিলো। ছোটবেলাতেই তিনি তার পিতাকে হারিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তার চাচা মেহমেট তেভিক এফেন্দির সাথে তৎকালীন ইস্তাম্বুলে এসেছিলেন। উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার পর তিনি আয়া সোভিয়াকেন্দ্রীক মসজিদ-মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ৫ বছর সেখানেই দ্বীন ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলো নিয়ে পড়াশুনা করেন। তবে এরপর তিনি তার এক বন্ধুর প্ররোচনায় উসমানীয় খিলাফত নিয়ে ষড়যন্ত্র করা তরুন তুর্কিদের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। যার অপরাধে সুলতান আব্দুল হামিদের সময় তাকে জেলেও যেতে হয়েছিলো। জেলে কিছুদিন থাকার পর তার মুক্তি হয় এবং ১৮৯৪ সালে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। তরুন তুর্কিদের সাথে যুক্ত হওয়ার পর তিনি কিছুতেই শান্তিতে থাকতে পারছিলেন না। বার বার তার মনে হচ্ছিলো, আমি কি ইসলামের ক্ষতি করছি? আমি কি তরুন তুর্কিদের সাথে যোগ দিয়ে খিলাফতের ক্ষতি করছি? এই অস্বস্তি থেকে তিনি ইংল্যান্ড থেকে তৎকালীন সুলতান আব্দুল হামিদ হানের কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি লেখেন। পরবর্তীতে সুলতান আব্দুল হামিদ তাকে ক্ষমা করেন এবং তাকে ইস্তাম্বুলে ফিরে আসা অনুমতি প্রদান করেন।

পরবর্তীতে তিনি ইস্তাম্বুলে ফিরে এসে সুলতান আব্দুল হামিদের সাথে সাক্ষাত করতে চান। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারনে তিনি কয়েকবার চেষ্টা করেও সুলতানের সাক্ষাৎ না পেয়ে হতাশ হয়ে আবারও ইংল্যান্ড চলে যান এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি লন্ডনে সেলিম ফারিস নামক এক ব্যক্তি সম্পাদিত পত্রিকা হারিয়াইটে লেখালেখি শুরু করেন। সেই পত্রিকায় তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সমস্যা এবং এ থেকে উত্তোরণের জন্য লিখতেন। কিন্তু পত্রিকার সম্পাদক সেলিম ছিলো তরুন তুর্কি ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত। সে হালিল হালিদকে সুলতান আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে প্রবন্ধ লেখার জন্য চাপ প্রয়োগ করে তাকে এর বিনিময়ে বেতনের বাইরেও বেশ বড় অংকের একটি অর্থ অফার করে। কিন্তু হালিল হামিদ তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সেই পত্রিকার চাকুরী ছেড়ে দেন। তিনি এই চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ছোটখাট একটি ব্যবসা শুরু করেন এবং এর পাশাপাশি সুলতান আব্দুল হামিদের মধ্যপ্রাচ্য ও বলকান নীতির পক্ষে দুটি প্রতিবেদন তৈরী করেন এবং সুলতানকে প্রেরণ করেন।

পরবর্তীতে তিনি তার ইউরোপীয় এক বন্ধুর সহায়তার ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তুর্কি বিষয় নিয়ে শিক্ষকতা ও লেকচার দেয়া শুরু করেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম উসমানীয় শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীতে কেমব্রিজ থেকে তিনি ‘উস্তাদে উলুম’ খেতাব লাভ করেন। কেমব্রিজে শিক্ষকতা করার সময় তিনি ইসলামি বিশ্বে ইউরোপীয় সংস্কৃতি কতটা ক্ষতি করছে সে বিষয়ে পর্যালোচনা করেন এবং সুলতান আব্দুল হামিদকে চিঠি মারফত জানাতে থাকেন। তিনি মিশর, সুদান ও আলজেরিয়া ভ্রমন করেন এবং সেখানকার মুসলমান ব্যক্তিবর্গদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, মুসলমানদের মধ্যে জাতিগত কিংবা গোত্রগত বিভেদ ভুলে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত।

ভ্রমণ শেষে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে এসে ইংল্যান্ডে একটি মসজিদ তৈরীর চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তার সেই মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় এবং তার কাছে থাকা মসজিদ নির্মাণের অর্থ বাজেয়াপ্ত করে। মসজিদ নির্মাণে ব্যর্থ হয়ে তিনি মিশরে চলে যান এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। পাশাপাশি কায়রোর বিভিন্ন মসজিদে তিনি বিশাল অংকের সাহায্য-সহযোগীতা করেন।

তুর্কি সিরিজে হালিল হালিদ বে

পরবর্তীতে তিনি আবারও ইস্তাম্বুলে ফিরে আসেন এবং সুলতান আব্দুল হামিদের পক্ষে এবং তরুণ তুর্কিদের বিপক্ষে গোপনীয় বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েন। যার যৎসামান্য তুর্কি আব্দুল হামিদ সিরিজে দেখানো হয়েছে। এভাবেই খিলাফতের বিভিন্ন কাজে আঞ্জাম দেয়া অবস্থাতেই ১৯৩১ সালে তুর্কি উসমানীয় এই বুদ্ধিজীবি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ যেন এই মহান বীর ও মুসলিম বুদ্ধিজীবিকে উত্তর ফায়সালা করেন এবং জান্নাত নছীব করেন। আমিন!

(মূলত এটি হালিল হালিদ বের সংক্ষিপ্ত একটি ইতিহাস। সম্প্রতি মিশর থেকে হালিল হালিদ বেকে নিয়ে বেশ বড়সড় একটি প্রবন্ধ বের হয়েছে। যা খুব শীঘ্রই এই ওয়েবসাইটেই আপডেট হবে ইনশাআল্লাহ!)

REFERENCE: Abdülhak Şinasi Hisar / Haftalık Edebî Muhasebe-Halil Hâlid’in Hayatı ve Eseri (Milliyet, 7.4.1931), Türk Ansiklopedisi (c. 18, 1943-1986), TDE Ansiklopedisi (c. 4, 1976), TDV İslâm Ansiklopedisi (c. 15, 1996), TDOE – TDE Ansiklopedisi 4 (2004), İhsan Işık / Türkiye Edebiyatçılar ve Kültür Adamları Ansiklopedisi (2006) – Ünlü Fikir ve Kültür Adamları (Türkiye Ünlüleri Ansiklopedisi, C. 3, 2013) – Encyclopedia of Turkey’s Famous People (2013), Halil Halid kime cevap verdi (dunyabizim.com, 29.07.2010), Tarık Yalçın / Sıradışı bir Osmanlı aydını; Halil Halid Bey (Dünya Bülteni / Tarih Servisi, dünyabizim.com, erişim 22.12.2010).

0 মন্তব্য
1

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!