স্বাধীনতার ঘোষণা শুরু হয় ‘নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লীয়ালা রাসূলিহীল কারিম’ পাঠ করে

by sultan

২৬ শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর ২৬ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত এই কেন্দ্র মোট ১৩ টি অধিবেশন সম্প্রচার করে বলে জানা যায়। প্রথম অধিবেশনে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর ২৬ শে মার্চ সন্ধা ৭ টা ৪০ মিনিটে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি’- এই বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে শুরু হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দ্বিতীয় অধিবেশন। কবি আবদুস সালাম কর্তৃক কোরআন শরীফ তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় মূল অধিবেশন। এরপর ডাক্তার আনোয়ার আলীর কাছে থেকে পাওয়া বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত ‘জরুরী ঘোষণা’ শীর্ষক স্বাধীনতার ঘোষণা-সম্পর্কিত প্রচারপত্রটি বিভিন্ন কণ্ঠে বারবার প্রচারিত হয়। বহির্বিশ্বের সাহায্য কামনায় ইংরেজিতে নিউজ বুলেটিনে কণ্ঠ দেন বেতারের প্রয়োজক আব্দুল্লাহ আল ফারুক। কবি আবদুস সালাম স্বাধীনতার পক্ষে ও পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলার সর্বস্তরের জনগণকে যার হাতে যা আছে তা নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

কবি আবদুস সালামের এই ঘোষণাকে বলা যেতে পারে, ২৬ মার্চের পাল্টা যুদ্ধ ঘোষণার পর বেতারের প্রথম বেসামরিক ঘোষণা। কী বলেছিলেন তিনি সেই ঘোষণাতে? আসুন সেই ঘোষণা পড়তে শুরু করি।

‘নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লীয়ালা রাসূলিহীল কারিম’

আসসালামু আলাইকুম,

প্রিয় বাংলার বীর জননীর বিপ্লবী সন্তানেরা। স্বাধীনতাহীন জীবনকে ইসলাম ধিক্কার দিয়েছে। আমরা আজ শোষক প্রভুত্বলোভীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি। এ গৌরবোজ্জ্বল স্বাধিকার আদায়ের যুদ্ধে, স্বাধীনতার যুদ্ধে, আমাদের ভবিষ্যৎ জাতির মুক্তিযুদ্ধে মরণকে বরণ করে যে জান-মাল কোরবানি দিচ্ছি, কোরআনে করিমের ঘোষণা- তারা মৃত নহে, অমর। দেশবাসী ভাইবোনেরা, আজ আমরা বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম করছি।

আল্লাহর ফজল করমে বাংলার আপামর নর-নারী আমাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম চলেছেন। আর সবখানে আমাদের কর্তৃত্ব চলছে। আমরা যারা সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছি-তাদের আপনারা সকল প্রকার সহযোগীতা দিন। এমনকি খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও সহায়তা দিন। স্বরণ রাখবেন দুশমনরা মরণকামড় দিয়েছে। তারা এ সোনার বাংলাকে সহজে তাদের শোষণ থেকে মুক্তি দিতে চাইছেনা। কোনো অবাঙালি সৈনিকের কাজেই সাহায্য করবেন না। মরণ তো মানুষের একবার। বীর বাংলার বীর সন্তানেরা শৃগাল-কুকুরের মতো মরতে জানেনা। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী।

কোনো গুজবে কান দেবেন না। খালি হাতে কয়েকজন মিলে কোনো পশ্চিমা মিলিটারির মোকাবিলা করবেন না। ওরা আমাদের দেশে এসে আমাদের খেয়েই শক্তি জুগিয়ে আমাদের নির্বিচারে হত্যা করবে-তা হতে পারে না। দশজন হলেও একজনকে খতম করুন। সমস্ত প্রকার অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। যারা নিরস্ত্র তারা অন্তত সোডার বোতল, বাজি প্রস্তুতকারীরা মরিচের গুড়ার ঠোঙা বানিয়ে ওদের প্রতি নিক্ষেপ করলে টিয়ার গ্যাসের কাজ করবে। বিজলি বাতির বাল্পে এসিড ভরে তাও নিক্ষেপ করুন। একেবারে খালি হাতে থাকবেন না। মরবেন তো মেরেই ইতিহাস সৃষ্টি করুন। ‘নাছরুম মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারিব। আল্লাহর সাহায্য ও জয় নিকটবর্তী।

১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ কলকাতা বেতার ষ্টেশন থেকে বিশ্ববাসীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য প্রচার করা হয়। তাতে দেখা যায় সর্বশেষে বঙ্গবন্ধু বলেন:

`May Allah bless you and help in your struggle for freedom. Joy Bangla.’ অর্থ- আল্লাহ তোমাদের উপর রহমত করুন এবং সাহায্য করুন। জয় বাংলা।

সুত্র: মোহাম্মদ মাহবুবুল হক, ‘কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা’, প্রথম আলো ২৬ শে মার্চ ২০১২

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলীলপত্র, পঞ্চম খন্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, হাক্কানী পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০১০ পৃষ্ঠা: ১১

প্রাগুক্ত, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩২

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!