মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী ফেজ টুপির স্বর্ণালী ও রক্তাক্ত ইতিহাস

by sultan
তুরস্কের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে রয়েছে একটি টুপি। যা ফেজ টুপি নামে পরিচিত। বিশেষ করে উসমানীয় শাসনের শেষের দিকে এই টুপি ব্যবহার দেখা যায় তুরস্কের মুসলমানদের মধ্যে। তবে ফেজ টুপির ব্যবহার অনেক আগে থেকেই। আর এটি শুরু থেকেই তুর্কি সংস্কৃতিতে ছিলো না। ফেজ নামের এই টুপিগুলো দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে আছে। এই টুপির সাথে যেমন জড়িয়ে আছে স্বণালী ইসলামী সংস্কৃতি তেমনি আছে রক্তাক্ত ইতিহাসও।  চলুন তবে জেনে আসি বহুল পরিচিত টুপি ‘ফেজ’ সম্পর্কে।

ফেজ টুপিকে তুরস্কের মুসলমানরা ‘রুমি টুপি বা রুমি ক্যাপ’ নামেও অভিহিত করে থাকেন। কারণ তুরস্কের বিখ্যাত কবি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি (রহ:) তিনি নাকি এই টুপি পড়ে মজলিসে বসতেন। পাশাপাশি ‘তরোবুশ বা চেচিয়া’ নামেও পরিচিত এই টুপি। টুপিটি মূলত প্রান্তহীন, সামান্য কোণাকৃতির, উপরিভাগ সমতল ও লোম দিয়ে তৈরি এবং উপরিভাগে সংযুক্ত থাকে একটি সূতাগুচ্ছ। প্রথম দিকের ফেজ টুপি পাগড়ি সম্বলিত ছিল এবং তা সাদা, লাল বা কালো রঙের হতো। ক্ষেত্রবিশেষে তৎকালীন সময়ে এই টুপির উপর পাগরীও পরিধান করা হতো।

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহঃ)

প্রাচীন মরক্কোর ফেজ শহরটিকে এই টুপির উৎস্যস্থল বলে ধারণা করা হয়। ৯৮০ সালের দিকে যখন ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক আব্বাসীয় খিলাফত এবং মিসরের ফাতেমী সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধের কারণে সাময়িকভাবে হজ্জ্বযাত্রা স্থগিত করা হয় তখন নীল নদের পশ্চিম পার্শ্বে সে সময় অবস্থান করা হজ্জযাত্রীরা হজ্জ্বের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সময় পর্যন্ত মরক্কোর ফেজ শহরে এসে জমা হয়। সে সময় একজন মুর মুসলিম ব্যবসায়ী সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের একটি টুপি তৈরী করে এবং বাজারে বিক্রি করা শুরু করে। বিপুল পরিমাণ হজযাত্রী সে সময় ফেজ শহরে অবস্থান করার কারণে খুব অল্প সময়েই এই টুপি জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং হাজার হাজার কপি বিক্রি হতে থাকে। সে সময় এই টুপিগুলোতে রং বেরংয়ের রেশমী সুতার তুলি লাগানো ছিলো। এভাবে তৎকালীন মরক্কো তথা ইউরোপ এবং উসমানীয় মুসলমানদের মধ্যে এই টুপিটি পরিধানের সংস্কৃতি চালু হয়। তবে সময়ের সাথে সাথে এই টুপির আকৃতি ও ডিজাইনও পরিবর্তন হতে থাকে। 

উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ

পরবর্তীতে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ (১৮০৮-৩৯) তার সিভিল অফিসারদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজনের ইচ্ছা পোষণ করলে এই ফেজ টুপিটির প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। প্রথমে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ইউরোপের ত্রিভূজাকার একটি টুপি ব্যবহারের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তার উপদেষ্টারা তাকে জানান যে, ইউরোপের ত্রিভূজাকার টুপি খ্রিষ্টানবাদের ট্রিনিটি প্রচার করে ফলে এটি ইসলামবিরোধী একটি সংস্কৃতি। এটি যদি রাষ্ট্রের অফিসারদের মধ্যে প্রচলন ঘটানো হয় তাহলে সাধারণ মুসলমানরা এর প্রতিবাদ করবে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ তাই খ্রিষ্টানদের টুপি বাদ দিয়ে মরক্কো থেকে উঠে আসো এই ফেজ টুপিই অফিসারদের পরিধানের জন্য নির্দেশনা জারি করেন। ফেজ টুপির শক্ত আবরণ নামাজে সিজদা দেয়ার সময় মাটি বা মেঝের সাথে কপাল স্পর্শে যেহেতু প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ ছিল, সে জন্য সুলতান এক ফরমান জারি করেন, ফেজ টুপিতে রূপান্তর ঘটানোর জন্য। যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব তুর্কি পুরুষের পরিধান করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়। কালের পরিবর্তনে পরবর্তী সময়ে এই টুপিটি তুর্কি নাগরিকদের চিহিৃতকরণের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছিলো। শুরুর দিকে এই টুপিকে জনপ্রিয় করতে কিছুটা সময় লাগলেও ১৯০০ সালের মধ্যে টুপিটি তুরস্কের জাতীয় টুপির খেতাব পায়। এছাড়া, ফেজ টুপি মরক্কোতে ফরাসী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছিলো।

ফেজ টুপি পড়া তুর্কি অফিসাররা

উসমানীয় খিলাফত ধ্বংস করে কামাল আতাতুর্ক যখন তুর্কি প্রজাতন্ত্র গঠন করলো তখন সে গভীরভাবে লক্ষ্য করলো যে, ফেজ টুপির মাধ্যমে রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে ইসলামি অনভূতি বিরাজ করছে। যা তার ধর্মনিরপেক্ষ তুর্কি রাষ্ট্র গঠনের পথে একটি বিশাল বাধা। তাই সে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ব্রিটিশ কালো হ্যাট এবং পোশাকের আমদানি করে তুরস্কের প্রশাসনের সামরিক কর্মকর্তা ও অফিসারদের মধ্যে প্রচলনের পাশাপাশি সাধারণ জনগনের মধ্যেও প্রচার করতে শুরু করে। এখানেই শেষ নয়, তুরস্ককে আধুনিকীকরণের অজুহাত তুলে ফেজ টুপি নিষিদ্ধ করে কুখ্যাত কামাল প্রশাসন। কিন্তু তখনও তুরস্কের জনগনের মধ্যে ইসলামের মুহব্বত ছিলো, ভালোবাসা ছিলো। ইসলামের সাথে সম্পর্কিত সংস্কৃতিগুলোকে তারা আকড়ে ধরে ছিলো। তাই ফেজ নিষিদ্ধের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তুরস্কের অঞ্চলে অঞ্চলে ফেজ টুপি নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে এ নিয়ে বেশ কয়েকটি দাঙ্গাও হয় সাধারণ তুর্কি মুসলমানদের। দাঙ্গা রুখতে নিরীহ মুসলমান জনগণের উপর সরাসরি গুলি চালানো হয়। যাতে নির্মমভাবে শহীদ হয় কমপক্ষে ৫০ জন মুসলমান। লাখ লাখ ফেজ টুপি সংগ্রহ করে সেগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এই হত্যাকান্ডের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত মানুষ প্রতিবাদ জানালেও ধীরে ধীরে এই ফেজ টুপি পরিধান কমে যেতে শুরু করে তুরস্কের জনগণের কাছ থেকে। ব্যাপকভাবে না হলেও এখনও তুরস্কের অনেক মুসলমান এই ফেজ টুপি পরিধান করে কামাল আতাতুর্কের সেই নির্মম হত্যাকান্ডের মৌন প্রতিবাদ জানান। খেলাফতের অধীনে থাকা মরক্কোয় পূর্ণভাবে এবং তিউনেশিয়ায় আংশিকভাবে এর ব্যবহার রয়েছে। সেই সাথে নাইজেরিয়াসহ অফ্রিকার মুসলিম প্রধানদেশের রাষ্ট্রনায়করা এখনো এর ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়াও মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে এর ব্যবহার রয়েছে।

ফেজ নিষিদ্ধ করে ব্রিটিশ হ্যাট ও কোর্টের প্রচলণ করে কামাল

ফেজ টুপি নিয়ে অজানা কিছু তথ্য:

  • ফেজ টুপি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিলো যে তৎকালীন সময়ে গ্রীক প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলো এই টুপিগুলো পরিধান করতো।
  • ইন্দোনেশিয়ায় এখনো ফেজ টুপি পড়া হয়। তবে সেটি কালো রংয়ের। ইন্দোনেশিয়ায় ফেজ টুপি ‘পেসি নামে পরিচিত’। একে কালো ফেজও বলা হয়। এই টুপি এখনো ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতির সাথে জড়িত এবং বিশেষ বিশেষ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এই টুপি সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক জেনারেলরা পরিধান করে থাকেন।
  • ‘পেসি’ নামে পরিচিত একটি বৈকল্পিক ইন্দোনেশিয়ান সংস্কৃতির একটি অঙ্গ, এবং বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় এটি পরা হয়।
  • ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তুর্কি সেনাবাহিনীর সৈন্যরা তাদের ইউনিফর্মের অংশ হিসাবে ফেজ টুপি পরতো।
  • ফেজ টুপি যে ব্যক্তি পরিধান করতো সেই ব্যক্তিকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সম্ভ্রান্ত হিসেবে মনে করা হতো।
    ব্রিটিশ শাসনাধীনে ভারতের মুসলিম অঞ্চলগুলো থেকে বাছাইকৃত সৈন্যরা ফেজ টুপি রয়েছে, যদিও হিন্দু ও মুসলিম পদাতিক ও ঘোড়সওয়ারদের সবাই পাগড়ি পরত।
  • পাকিস্তানের বাহওয়ালপুর ল্যান্সারস রেজিমেন্টে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত সবুজ রঙের ফেজ চালু ছিল। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় অনেক আফ্রিকান স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী, যারা ফরাসিদের পক্ষে কাজ করেছে তারা ফেজ টুপি মাথায় ধারণ করে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।
  • পুরনোপন্থী কোনো হায়দরাবাদী মুসলিম ভদ্রলোক শেরওয়ানি চাপিয়ে মাথায় ফেজ টুপি পরলে সেটিকে অনিবার্যভাবে রুমি টুপি বলা হবে। ভারতীয় উপমহাদেশে রুমি টুপি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ইসলামি পরিচিতির প্রতীক এবং অটোম্যান সুলতানের নেতৃত্বে খিলাফতের প্রতি সমর্থনের দৃষ্টান্ত। 

সুত্র:
https://menwit.com
Wiki
Ottoman History (Old Collection Page)

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!