উসমানীয়দের কুস্তি সংস্কৃতি এবং মহান সুলতান মুরাদের ঘটনা

by sultan

সামরিক প্রশিক্ষন উসমানীয় সালতানাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ ছিলো। উসমানীয়দের সময়েই সমরনীতির নানা কৌশল এবং নানা সমরবিদ্যার সূচনা হয়েছিলো। এর মধ্যে অন্যতম হলো কুস্তি। উসমানীয়রা কুস্তি লড়তে খুবই পছন্দ করতো। কারণ হিসেবে তারা বলতো, নবীজী (সাঃ) তিনি আরবের অন্যতম শক্তিশালী পালোয়ান রুকান্নাকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কুস্তিতে পরাজিত করেছিলেন এবং এক অনুষ্ঠানে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দুই যুবককে কুস্তি লড়িয়েছিলেন। আর নবীজী (সাঃ) এর অনুসরণ হিসেবেই তুর্কিরা কুস্তিকে নিজেদের প্রিয় করে নিয়েছিলো।

উসমানীয় কুস্তিগীর

মধ্য এশিয়ার তুর্কিরা যারা উসমানীয়দের পূর্বপুরুষ ছিলেন তারাও কুস্তিতে অনেক উৎসাহী ছিলেন। উসমানীয় সুলতানরা এবং তুর্কি ধনী মুসলমানরা কুস্তিতে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সুলতানরা প্রতি বছরের বিভিন্ন সময়ে কুস্তি প্রতিযোগীতার আয়োজন করতেন। উসমানীয়দের শাসনাধীন বলকান থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা এমনকি পবিত্র মক্কা নগরীতে পর্যন্ত কুস্তি প্রশিক্ষণালয় খুলেছিলেন উসমানীয় সুলতানরা। প্রতি সপ্তাহের জুমুয়াবার বিভিন্ন অঞ্চলের কুস্তিগীরদের সমন্বয়ে প্রতিযোগীতার আয়োজন হতো। উসমানীয় সুলতানরা বলতেন, জুম্মার দিন যেহেতু ঈদের দিন যেহেতু আমরা কুস্তির মাধ্যমে এবং ইবাদতের মাধ্যমে এ দিন অতিবাহিত করবো। সুলতানরা কুস্তিগীরদের প্রশিক্ষণের খরচ ও খাবারের খরচ বহন করতেন। উসমানীয় সুলতান সুলেমান আল কানুনী তিনি তার শাসনামলে কুস্তিগীরদের জন্য দৈনিক মজুরির ব্যবস্থা করেছিলেন।

সুলতানের উপস্থিতিতে কুস্তি প্রতিযোগীতা

উসমানীয় সুলতানদের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষন নেয়া ও কুস্তি প্রশিক্ষণ নেয়াকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন পরাক্রমশালী সুলতান চতুর্থ মুরাদ। শারীরিকভাবেই তিনি অনেক শক্তিশালী ছিলেন এবং নিজেই একজন কুস্তিগীর ছিলেন। তিনি প্রায়ই তার দরবারশালার পাশা, আগা এবং কমান্ডারদের সাথে কুস্তি লড়তেন। সুলতান মুরাদের কুস্তি লড়ার বিষয়ে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। সুলতান মুরাদ একবার গোসল সেরে এসে সিংহাসনে বসলেন। কিন্তু হঠাৎই তার খেয়াল হলো তিনি কুস্তি লড়বেন। এজন্য তিনি গায়ে তেল মাখতে যাচ্ছিলেন। এটি দেখে তার এক সেবক তাকে বললো, সুলতান! আমি মাত্র গোসল সেরে এসেছেন। সারাদিন আপনাকে সালতানাতের কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে। এখন যদি গায়ে তেল মেখে কুস্তি লড়েন তাহলে ক্লান্ত হয়ে যাবেন এবং সারাদিনের কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। এটি শুনে সুলতান মুরাদ সেই সেবককে এক হাতে তুলে শুন্যে ঘোরাতে লাগলেন। তখন সেই সেবক সুলতানের অসামান্য শক্তি দেখে চিৎকার করে ক্ষমা চাইতে লাগলো। তখন সুলতান মুরাদ তাকে নিচে নামিয়ে দিলেন এবং তাকে স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে পুরস্কৃত করলে।

সুলতান চতুর্থ মুরাদ

কুস্তিগীরদের প্রশিক্ষণের জন্য সালতানাতের অঞ্চলসমূহে যেসব প্রশিক্ষনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিলো সেগুলো ‘টেক্কা’ নামে পরিচিত ছিলো। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যে শুধু কুস্তিই শেখানো হতো তাই নয় বরং তীরন্দাজিও শেখানো হতো। পাশাপাশি কুস্তিগীররা যা চারিত্রিকভাবেও উত্তম হয়ে উঠতে পারে সেজন্য এসব প্রশিক্ষনকেন্দ্রগুলোতে উসমানীয় সুলতানরা সুফি আলেমদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। সুফি আলেমরা ধর্মীয়ভাবে কুস্তিগীরদের শিক্ষিত করে তুলতো এবং তাদের পর্যাপ্ত নসিহত করতেন।

উসমানীয়দের কুস্তি প্রশিক্ষণকেন্দ্র

কুস্তিগীরদের জন্য একটি শপথবাক্য তৈরী করে দিয়েছিলেন সুলতান মুরাদ। শপথবাক্যটি হলো:‘‘ হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! সমস্ত মাখলুকাতের মালিক আপনি, নবীজী (সাঃ) এর হাত আমাদের মাথার উপর, আমাদেরকে নবীজী (সাঃ) এবং আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) এর মতো শক্তি প্রদান করুন।’’

পরবর্তীতে উসমানীয় সালতানাতের পতন হলে অনেক উসমানীয় সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। কিন্তু এখনো হারিয়ে যায়নি কুস্তি। এখনো তুরস্কের সংস্কৃতিতে কুস্তির অনেক গুরুত্ব রয়েছে। তুরস্কের বিভিন্ন শহরে এখনো বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কুস্তির আয়োজন করা হয়। যা ‘তৈল কুস্তি নামে পরিচিত। একে তুর্কি ভাষায় ‘কিরকপিনার’ নামে অভিহিত করা হয়। গায়ে অতিরিক্ত তেল মেখে এই কুস্তি লড়েন কুস্তিগীররা। ইউরোপীয়রা যাকে বলে ‘ওয়েল রেসলিং’। আগামী কোনো আর্টিকেল তুরস্কের বর্তমান ওয়েল রেসলিং নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে ইনশাআল্লাহ!

  • সুত্র:
  • [1] Birgit Krawietz, “The Sportification and Heritagisation of Traditional Turkish Oil Wrestling”, The International Journal of the History of Sport 29, no. 15 (October 2012): 2156.
  • Krawietz, “Turkish Oil Wrestling”, 2156.
  • Andolu Agency, “Turkish wrestlers eye medal haul at 2020 Olympics”, Daily Sabah, December 28, 2017
0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!