সুলতান আব্দুল হামিদ ছানীর রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা কার্যক্রম

by sultan

একটি দেশ কখনই সেনাবলে পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে না। পরাক্রমশালী হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় শক্তিশালী গোয়েন্দা কার্যক্রম। মুসলিম ইতিহাসের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দেই তাহলে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী, সুলতান মুহম্মদ আল ফাতিহসহ শত শত মুসলিম সিপাহসালার তাদের দক্ষ গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে বহু যুদ্ধে অত্যন্ত কম রক্তপাতেই বিজয়ী হয়েছেন, শত্রুপক্ষের বিপরীতে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন।

সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী

সালাউদ্দিন আইয়ুবীর সময়ে মুসলমানদের গোয়েন্দাবৃত্তি আকাশচুম্বি পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিলো। যার সুত্র ধরেই ইসলামী দুনিয়ায় পরবর্তীতে জনপ্রিয় হয়েছিলো গোয়েন্দা কার্যক্রম। উসমানীয় আমলেও মুসলমানদের গোয়েন্দা কার্যক্রম অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলো।  তবে ইতিহাসে উসমানীয়দের হোয়াইট বেয়ার্ডস বা সাদা দাড়িওয়ালা সংগঠনের কার্যক্রমই বেশি প্রকাশ পেয়েছে।  কিন্তু সাদা দাড়িওয়ালাদের কার্যক্রম সুলতান মুহম্মদ আল ফাতিহর কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের পরই বিলুপ্ত হয়ে যায়।  সুলতান সুলেমান এবং সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের আলাদা এলিট গোয়েন্দা বাহিনীই ছিলো। যা ইতিহাসে পাওয়া যায়।  উসমানীয় শাসনের শেষের দিকেও উসমানীয়দের গোয়েন্দাবৃত্তি অব্যাহত ছিলো। বর্তমান তুরস্ক প্রশাসনের যে গোয়েন্দা কার্যক্রম রয়েছে তার সিংহভাগই উসমানীয়দের তৈরী করে যাওয়া। উসমানীয় শেষ যোগ্য সুলতান আব্দুল হামিদ (রহ) তার রাষ্ট্রপরিচালনা এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে শক্তিশালী গোয়েন্দা ইউনিট তৈরী করেছিলেন।

101 years since death of Sultan Abdulhamid II marked
সুলতান আব্দুল হামিদ (রহ)

১৮৭৬ সালে উসমানীয় সিংহাসনে দুইজন সুলতান আসীন হন।  প্রথমত; সুলতান আব্দুল আজিজ। যিনি সিংহাসনে বসার কিছুদিনের মাথায় নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন। এরপর সুলতান ৫ম মুরাদ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শাসনকার্য পরিচালনায় অক্ষম হয়ে যান। অবশেষে সুলতান আব্দুল হামিদ উসমানীয় সিংহাসনে বসেন। সুলতান আব্দুল হামিদ সিংহাসনের বসার কয়েকদিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে দুটি বিদ্রোহ হয়। যাতে মদদ দিয়েছিলো ইহুদী ফ্রিম্যাশনারী ও ব্রিটেন। কারণ সুলতান আব্দুল হামিদ পশ্চিমাদের কট্টরবিরোধী ছিলেন এবং প্রবল ইসলামপ্রিয় ছিলেন।  সুলতান আব্দুল হামিদ শক্ত হাতে বিদ্রোহ দুটি দমন করেছিলেন।  এমনকি সুলতানকে সরাসরি হত্যার জন্য দুইবার চেষ্টা করা হয়েছিলো।  কিন্তু সুলতান আব্দুল হামিদ কিশোর বয়স থেকেই অত্যন্ত বাস্তবধর্মী, ন্যায়পরায়ন, দক্ষ সামরিক কুশলী ও সতর্ক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।  ছোটবেলা থেকেই তিনি গোয়েন্দাবৃত্তির উপর বিশেষ আগ্রহ রাখতেন।  

https://iadsb.tmgrup.com.tr/3709ce/0/0/0/0/1000/750?u=http://i.tmgrup.com.tr/dailysabah/2016/12/01/the-evolution-of-ottoman-era-secret-services-1480624642427.jpg
ইলদিজ প্রাসাদ ও গোয়েন্দা দফতর

পশ্চিমাদের লিখিত গোয়েন্দা কার্যক্রমের সব বই তিনি পড়তেন ও নিজের সংগ্রহে রাখতেন। এজন্য তিনি সিংহাসনে বসেই উসমানীয় সালতানাতের সুরক্ষায় আধুনিক গোয়েন্দা ইউনিট তৈরী করেন।  তিনি যে প্রাসাদে বসবাস করতেন তার উপর ভিত্তি করেই তিনি ১৮৮০ সালে ‘ইলদিজ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস’ গঠন করেন।  এর আগে ১৮৩৪ সালে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ‘জাবতিয়ে মুশিরলিগী’ নামে একটি গোপন পুলিশ সদর দফতর গঠন করেছিলেন যারা উসমানীয় সালতানাতের রাজধানীতে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকতো।  দেশের অভ্যন্তরে কি ঘটছে তা রিপোর্ট করতে হতো এই দফতরে।  পরবর্তীতে তা সরাসরি সুলতানের কাছে পৌছানো হতো।  এই দফতর প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছিলেন তৎকালীন গ্রান্ড ভিজিয়ার সাঈদ পাশা এবং গ্রীক উসমানীয় নাগরিক সিভিনিস।  যদিও পরবর্তীতে এই সাঈদ পাশা উসমানীয় সালতানাত ধ্বংসকারী তরুণ তুর্কিদের সাথে যোগ দিয়ে রাষ্ট্রের অন্যতম বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছিলো।

সুলতান আব্দুল হামিদ ইলদিজ প্রাসাদভিত্তিক গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করার পর লক্ষ্য করেছিলেন যে, উসমানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সিংহভাগই নীতি-নৈতিকতা থেকে অনেক দুরে। তিনি তাই গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করেছিলেন এবং তাদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।  তিনি এটি এজন্যই করেছিলেন যাতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লোভ-লালসা থেকে দুরে থেকে রাষ্ট্রের কাজে একনিষ্ঠভাবেন আত্মনিয়োগ করতে পারে।  তার এই কৌশল সফল হয়।  গোয়েন্দা কর্মকর্তারা শুরুতেই বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা অপারেশন অত্যন্ত নিখুতভাবে সম্পন্ন করে।  বৃদ্ধি পেতে থাকে মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা সদস্য।  অল্প কয়েকদিনের মধ্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৩০ হাজারে।  মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা দরবেশ, দাগেস্তানের মোল্লা, ভারতীয় ভিক্ষুক, সুদানী পর্যটক, লিবিয়ান শেখ, কুদি ও আফগান নাগরিক, তাতারি হাজীর ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতো এবং তথ্য সংগ্রহ করতো।  এমনকি পাশ্চবর্তী শত্রু  রাষ্ট্রগুলোর বাজার, দোকান-পাট কিংবা প্রশাসনেও ঢুকে গিয়েছিলো তুর্কি গোয়েন্দা সদস্যরা।  তারা সেসব দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসও শুরু করে দিয়েছিলো।  সে সময় দেশের তথ্য, গোপন কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হয়ে তারা সরাসরি ইলদিজ প্রাসাদে সুলতানের কাছে গোপন কোডের মাধ্যমে প্রেরণ করতো।  কাগজে লিখিতভাবেও পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে থাকা কিংবা তুরস্কের অভ্যন্তরে থাকা গোয়েন্দারা গোয়েন্দা রিপোর্ট সুলতানের কাছে প্রেরণ করতো।  লেখাটি যে গোয়েন্দারা পাঠিয়েছে এই বিষয়টি সুলতান বুঝতেন চিঠির একপ্রান্তে থাকা নির্ধারিত একটি সিল দেখে।  সুলতান গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো পড়ে যদি মনে করতেন যে, রিপোর্টটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তখন তিনি চিঠিতে থাকা গোয়েন্দা সিলটি ছিড়ে নষ্ট করে ফেলে এরপর বাকী অংশটুকু প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিতেন।  কারণ সুলতান জানতেন, প্রশাসনের ভেতর উসমানীয় খিলাফতবিরোধী গুপ্তচর রয়েছে।

Spies of the Sultan
সুলতানকে পাঠানো গোয়েন্দাদের চিঠি
M. Ballan on Twitter: "Letters sent from the Ottoman Empire to Mai Idris  Alooma of Bornu in central Africa, ca. 1577… "
সুলতানকে পাঠানো এক আফ্রিকান গোয়েন্দার রিপোর্ট

সুলতান আব্দুল হামিদ ছানী (রহ:) কে যখন বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো তখন সুলতানের কাছে পাঠানো অপঠিত অনেক চিঠি খোলা হয়েছিলো।  চিঠিগুলো খোলার পর সবাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলো।  কারণ যে গোয়েন্দারা চিঠিগুলো প্রেরণ করেছিলো তাদের মধ্যে অনেকেই তরুন তুর্কি আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলো।  অর্থাৎ তরুন তুর্কিদের মধেও সুলতানের আজ্ঞাবহ গোয়েন্দারা ছিলো।  এ বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর হাজার হাজার গোয়েন্দা চিঠি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।  প্রায় ৩ দিন ধরে সেসব চিঠি পোড়ানোর আগুন জ্বলতে থাকে।

ব্যর্থতা হোক কিংবা সাফল্য কম পেলেও সুলতান আব্দুল হামিদ মুসলিম উম্মাহর খিদমত এবং উসমানীয় খিলাফতকে টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।  তার চেষ্টাগুলোর মধ্যে গোয়েন্দাবৃত্তি ছিলো অন্যতম।  কিন্তু সুলতান যেসকল কর্মকর্তাদের উপর বিশ্বাস করে গোয়েন্দা ইউনিট গড়ে তুলেছিলেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই পরবর্তীতে সুলতানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।  যার দরুণ ক্ষমতাচ্যুত হন সুলতান।  তবে সুলতান আব্দুল হামিদের উম্মাহর খিদমতে এসকল অমর র্কীর্তি যুগ যুগ ধরে মুসলিম প্রজন্ম স্বরণ করবে, শিক্ষা গ্রহণ করবে।

সুত্র:
https://www.dailysabah.com
ইন্টারনেট

0 মন্তব্য
0

Related Posts

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!